কয়েক হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার পর নতুন কর্মী নিতে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। শনিবার, ১০ অক্টোবর ব্যাংকটি ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জিবি) ও ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে পরীক্ষা নেয়। পরীক্ষায় অর্ধলক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তবে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা। প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নের অর্ধেকই ইসলামি জ্ঞান সম্পর্কিত। এর মধ্যে ধর্মীয় পুস্তক থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন ছিল। পাশাপাশি ধর্মীয় রীতি, ইতিহাস ও মুসলমানদের উপর ফরজ করা বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করা হয়। ফলে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের অনেকের জন্য উত্তর দেয়া কঠিন ছিল।
নিয়োগ পরীক্ষার এমসিকিউ প্রশ্নপত্রে ৫৭ নম্বর প্রশ্ন ছিল, ‘জামাতে সালাত আদায় করলে একাকী আদায়ের চেয়ে কতগুণ বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়?’ প্রশ্ন এসেছে, ‘কোন সুরায় বিসমিল্লাহ নেই’, ‘জন্মান্ধকে চোখ দান করা কোন নবীর মুজেযা’ কিংবা ‘হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর উপর কয়টি সহিফা নাযিল হয়েছিল’-এমন সব প্রশ্ন। ১০০ নম্বরের মধ্যে এমন প্রশ্নই ছিল ৫০টি।
প্রশ্ন উঠেছে, ইসলাম ধর্মালম্বীরা ছাড়া অন্য ধর্মালম্বীরা কি তবে এই ব্যাংকে নিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরাও কী এসব প্রশ্নের উত্তর জানেন? নাকি ব্যাংকের চাকরির সাথে এসব প্রশ্ন সামঞ্জস্যপূর্ণ?
তৌহিদুল আলম নামে এক আবেদনকারী বলেন, ‘এর আগে ৬টি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েছি। এতে প্রতিটি পরীক্ষা হয়েছে ইংরেজিতে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের প্রশ্নপত্র দেখে হতভম্ব হয়েছিলাম। এবারই প্রথমবারের মত ব্যাংকের পরীক্ষা দিয়েছি বাংলা প্রশ্নপত্রে। আরও বেশি অবাক হই, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে ৫০ মার্কের প্রশ্নপত্র দেখে। কারণ পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। তবুও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছি। কত নম্বর পেলে জিবি পদের জন্য মনোনীত হবো তা নির্ধারণ করা ছিল না নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে।’
শুধুমাত্র এমসিকিউর মাধ্যমে প্রকৃত মেধা যাচাই করা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্য ব্যাংকের মত অর্ধ শতাংশ এমসিকিউ এর সাথে অর্ধ শতাংশ লিখিত থাকা জরুরি। কিন্তু তা ছিল না ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে।’
এ নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে চলছে নানা সমালোচনা। কেউ কেউ ফেসবুক পোস্টে লিখছেন, ‘ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় মাদ্রাসার প্রশ্নপত্র।’
এ পরীক্ষায় অন্য ধর্মের কেউ ছিলনা? এমন প্রশ্ন করেছেন জাহেদ ইসলাম নামে একজন। তিনি আরও লিখেন, ‘আচ্ছা অন্য ধর্মাবলম্বীরা কি ইসলাম নিয়ে স্টাডি করে? নাকি শর্ট লিস্টের মাধ্যমে তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে? নাকি কোটাভিত্তিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আগে রেডি হয়ে গেছে? আমার মনে এমনও হাজার প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে।’
ইসমাইল হোসেন নামে একজন লিখেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন দেখে প্রথম ভাবেছি এটা কোনো ফোরকানিয়া মাদ্রাসার নিয়োগ পরীক্ষা।’
এমন প্রশ্নপত্রের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংক অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডাইরেক্টর (এএমডি) ড. এম কামাল উদ্দীন জসীম পতাকানিউজকে বলেন, ‘এটি ব্যাংকের একদম লোয়ার ক্লাসের চাকরি। এটি এন্ট্রি গ্রেড। এর চেয়ে নিচের গ্রেড ব্যাংকে নেই। এজন্য আমরা বাংলায় প্রশ্ন করেছি। এছাড়া থার্ড ডিভিশন রেজাল্টধারীরাও আবেদন করতে পেরেছে। ডিগ্রি পাসও আবেদন করতে পেরেছে।’
ড. এম কামাল উদ্দীন জসীম বলেন, ‘নৈতিকতার বিষয়ে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের জানা আছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক হিসেবে ইসলামী চর্চা এখানে করা হয়। সে কারণে এ বিষয়গুলো আমার গুরুত্ব দেই। আমাদের ব্যাংকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কর্মকর্তা রয়েছে। এছাড়া মেয়েদেরও কন্ট্রিবিউশন রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে কোনো ব্যাংকে আমাদের চেয়ে বেশি মেয়ে নেই। অন্য ধর্মালম্বীরা আবেদন করতে পারবে না এমন কোন কন্ডিশন আমরা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে রাখি না। প্রচুর হিন্দু ধর্মালম্বী এবারের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এরা রেজাল্টও ভালো করে।’
প্রশ্নপত্র অনুযায়ী ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মাম্বীরা উত্তর করতে না পারলে তাদের মূল্যায়ন কিভাবে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রেজাল্ট আসুক তারপর দেখা যাবে। আশা করি এতে কোনো বৈষম্য হবে না। যদি ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার জন্য কেউ ফেল করে তার জন্য আমরা এখানো কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। হিন্দু ধর্মালম্বীরা অনেক মেধাবী হয়ে থাকেন। এছাড়া তারা আমাদের চেয়ে বেশি ভালো জানে।’
নিয়োগ পরীক্ষায় ইসলামিক প্রশ্ন বেশি অন্য বিষয়গুলো কম ছিল এ বিষয়ে ব্যাংকার হিসেবে জসীমের মূল্যায়ন জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘সকল বিষয় থাকা দরকার। তবে প্রশ্ন আমি করিনি। প্রশ্ন পত্র তৈরির জন্য অন্য একটি কর্তৃপক্ষ রয়েছে। এছাড়া এটি একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষ যেভাবে চায় প্রশ্ন করতে পারে। এ বিষয়ে আমার বিশেষ কোনো মন্তব্য নেই। আমকে রিক্রুটমেন্টের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’
ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন পর এবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়। ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েব সাইট ‘আইবিবিএল ক্যারিয়ার’ এ নিয়োগ পরীক্ষার জন্য আবেদন করতে হয়েছিল চাকরী প্রত্যাশীদের। গত ১৪ অক্টোবর এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ব্যাংকটি। আবেদনের শেষ সময় ছিল ১৬ অক্টোবর। দুই পদের জন্য ১ লাখ ৪৬ হাজার শিক্ষার্থী আবেদন জমা দেন। শনিবার, ১ নভেম্বর রাজধানীর ৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেসরকারি খাতের এই ব্যাংকের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এই পরীক্ষার্থীদের থেকে সাড়ে তিন হাজার কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ব্যাংকটির। এর মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে চাকরিচ্যুতের কারণে শুন্য হওয়া কর্মকর্তাদের পদ পূরণ করা হবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ আট বছর ইসলামী ব্যাংক ছিল আর্থিক খাতের সমালোচিত চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। ওই সময় ব্যাংকটির প্রায় অর্ধেক টাকা একাই বের করে নেয় গ্রুপটি, যা এখন আদায় হচ্ছে না। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর ব্যাংকটিতে প্রায় ১০ হাজার ৮৩৪ কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। কোনো ধরনের নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই এসব কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এস আলমের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলার কর্মী ছিলেন ৭ হাজার ২২৪ জন। চট্টগ্রামের সাত হাজারের বেশি কর্মীর মধ্যে আবার এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের নিজ উপজেলা পটিয়ার বাসিন্দা ছিলেন ৪ হাজার ৫২৪ জন। কোনো ধরনের নিয়মনীতি ছাড়া নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের নিয়েই এখন বেকায়দায় রয়েছে ব্যাংকটি।
গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পালিয়ে যান এস আলম ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। এরপর ব্যাংকটির দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োজিত স্বতন্ত্র পরিচালকেরা। ব্যাংকটির পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ব্যাংকটি থেকে প্রায় চার হাজার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এখন ব্যাংকটি নতুন করে আবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে জনবল নিয়োগের পথে হাঁটছে। সামনে আরও বিজ্ঞপ্তি আহ্বান করার পরিকল্পনা করছে।
পতাকানিউজ/আরএস/কেএস

