দুয়ারে কড়া নাড়ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বিশ্বের সর্বোচ্চ সংস্থা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া এ উৎসব ঘিরে চট্টগ্রামে এখন উৎসবের আমেজ ও সাজ সাজ রব। মণ্ডপ থেকে প্রতিমালয় সবখানেই চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তবে উৎসবের মাঝে রয়েছে শঙ্কা—কারণ প্রতিবছর পূজা ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠে সাম্প্রদায়িক চক্র। এবারের পূজায়ও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর নেতারা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সব মণ্ডপকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক শক্তি তৎপর হয়ে উঠতে পারে বলে শঙ্কা নেতাদের। তবে প্রশাসনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস মিলেছে বলেও জানান তারা। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক, সেনাবাহিনী, ডিআইজি, পুলিশ সুপারসহ সব থানার ওসির সঙ্গে পূজা পরিষদ নেতাদের বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
১৫ উপজেলায় যত মণ্ডপ
পূজা পরিষদের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে ১৫ উপজেলায় এবার ২ হাজার ১১৪টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে প্রতিমা পূজা ১ হাজার ৬১৪টি এবং ঘট পূজা ৫৭৯। তবে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপের সংখ্যা চিহ্নিত করা হয়নি।
মহানগরীর ১৬ থানায় যত মণ্ডপ
মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য মতে, এবার নগরের ১৬ থানার ৪১ ওয়ার্ডে প্রতিমা ও ঘট পূজা মিলে ২৯২টি মণ্ডপে পূজা হবে। গতবছরও পূজা মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ২৯২টি। এর মধ্যে কর্ণফুলী উপজেলায় ২৩টি ও হাটহাজারীতে ২টি পূজামণ্ডপও রয়েছে।
গুজবে কান নয়
ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক পোস্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা এবং গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পূজা পরিষদ নেতারা। এছাড়া আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পূজা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি ২৫ নির্দেশনা দিয়েছে।
কী বলছেন পূজা পরিষদ নেতারা?
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট নিতাই প্রসাদ ঘোষ পতাকানিউজকে বলেন, ’প্রশাসন সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে। আমরাও দেখছি গতবারের চেয়ে এবার আরও বেশি তৎপর প্রশাসন। এরপরও আমরা শঙ্কায় রয়েছি। কারণ সামনে সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে হিন্দুদের প্রতিবার টার্গেট করা হয়। কাজেই সাম্প্রদায়িক শক্তি এবারের পূজায়ও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি। প্রশাসনের পাশাপাশি সব পূজা মণ্ডপে আমরা নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি। এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা গতবারের মত বলে জানান তিনি।

মহানগর পূজা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ পতাকানিউজকে বলেন, ‘শারদীয় দুর্গোৎসবকে বাঙালির উৎসব হিসেবেই আমরা প্রতিবছর পালন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ সময়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মিলেমিশে এ উৎসবকে সম্পন্ন করতে চাই। এরপরও শঙ্কা থেকে যায়। কারণ সামনে নির্বাচন। এ নির্বাচনকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রতিবার মাথাছাড়া দিয়ে উঠে। তারা হিন্দুদের ট্রাম্প কার্ড বানিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়। যদিও আমরা প্রশাসনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়েছি। এছাড়া নিজেরাও প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা লাগানোর পাশাপাশি আইডি কার্ডসহ সার্বক্ষণিক মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক রাখার নির্দেশনা দিয়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ তালিকা আমরা এখনও তৈরি করিনি। তবে সব মণ্ডপকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছি।
তিনি বলেন, বিশেষ করে পূজার সময় ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছড়ানো হয়। সেসব বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকবে হবে। কোনোপ্রকার গুজবে কান দেয়া যাবে না। যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। পূজা চলাকালীন আমাদের সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম খোলা থাকবে। ভিজিল্যান্স টিম প্রতিটি মণ্ডপ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে।

তিনি আরও বলেন, পূজায় ১৬ থানার পূজা কমিটিকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মণ্ডপে ডিজে গান না বাজাতে বলা হয়েছে। আজানের সময় বাদ্যযন্ত্র বন্ধ এবং নির্দেশনা মেনে রাত ১২টার মধ্যে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে বলা হয়েছে।
সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা গতবছর সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিসর্জন সম্পন্ন করেছিলাম। যদি আবহাওয়া ও বির্সজনের যাওয়া-আসার স্থানসহ সব অবকাঠামো ঠিক থাকে তাহলে হয়ত সম্ভব হবে। বিষয়টি আমরা সিটি করপোরেশনকে অবহিত করেছি।’
প্রতিবার জেএমসেন হলকে পূজা মণ্ডপকে টার্গেট করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হয়, এবার পরিষদের কেমন প্রস্তুতি রয়েছে-এমন প্রশ্নের উত্তরে নিখিল কুমার নাথ বলেন, ‘পরপর দুবছর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। আমরাও সভায় বিষয়টি তুলে ধরেছি। এছাড়া পরিষদের সবাইকে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
কখন শুরু, কখন শেষ পূজা
পঞ্জিকা অনুযায়ী আগামী ২১ সেপ্টেম্বর (রবিবার) শুভ মহালয়া। মহালয়ার দিন থেকে শুরু হয় পূজার ক্ষণগণনা। ২৮ সেপ্টেম্বর (রবিবার) ষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। ২ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় উৎসব।
দেবীর আগমন ও গমন
শাস্ত্র অনুযায়ী দেবী দুর্গা এবার মর্তে আগমন করবেন গজে বা হাতিতে। আর গমন করবেন দোলায় বা পালকিতে।
পতাকানিউজ/আরবি

