বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরী ঢাকা। বছরের পর বছর রাজধানীর বাতাস মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় থেকেছে। তবে চলতি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ করেই বায়ুমান কিছুটা উন্নত হয়েছে। কিন্তু এই উন্নতি স্থায়ী নাকি সাময়িক—সেই প্রশ্নই এখন আলোচনায়।
মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার জানিয়েছে, ঢাকার বাতাসের একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) স্কোর দাঁড়িয়েছে ৭১। সূচক অনুযায়ী এটি ‘মাঝারি’ বা সহনীয় মানের মধ্যে পড়ে। দীর্ঘদিন পর রাজধানীর বায়ুমান কিছুটা স্বাস্থ্যকর অবস্থায় আসলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থান মূলত সাময়িক পরিবেশগত প্রভাবের কারণে।
অন্যদিকে একই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল গণতান্ত্রিক কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা (স্কোর ১৫৩)। এরপর ক্রমানুসারে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা (১৩৭), পাকিস্তানের লাহোর (১৩৪), সৌদি আরবের রিয়াদ (১১১) ও ভারতের নয়াদিল্লি (১০৭)। তালিকায় ঢাকার অবস্থান তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও ঝুঁকি কাটেনি।
একিউআই স্কোর শূন্য থেকে ৫০ হলে তা ভালো, ৫১ থেকে ১০০ মাঝারি। তবে ১০১ থেকে ১৫০ হলে সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর ধরা হয়। ১৫১ থেকে ২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-এর বেশি হলে তা দুর্যোগপূর্ণ। অর্থাৎ ঢাকার বর্তমান স্কোর সহনীয় হলেও যেকোনো সময় তা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, বায়ুদূষণ সব বয়সী মানুষের জন্য ক্ষতিকর। তবে শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, বায়ুদূষণজনিত কারণে স্ট্রোক, হৃদরোগ, শ্বাসযন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগ, ফুসফুসের ক্যানসার ও সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মারা যায় কেবল এই কারণে।
বাংলাদেশে একিউআই নির্ধারণ করা হয় পাঁচটি উপাদানের ওপর ভিত্তি করে—পিএম১০, পিএম২.৫, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড (এনও₂), কার্বন মনো-অক্সাইড (সিও), সালফার ডাই-অক্সাইড (এসও₂) এবং ওজোন (ও₃)। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঢাকার বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান উৎস হলো—ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণসাইটের ধুলা।
পরিবেশবিদদের একাংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক বায়ুমান উন্নতির পেছনে বৃষ্টি ও মৌসুমি আবহাওয়া বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে ঢাকার মূল সংকট—অসংখ্য ইটভাটা, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ ও যানবাহনের ধোঁয়া—এখনো অমীমাংসিত। কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর বাতাস নির্মল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ঢাকার মানুষ এখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারলেও সামনের দিনগুলো নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। কারণ বায়ুদূষণের মূল উৎসগুলো যেভাবে রয়ে গেছে, তা বন্ধে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ না এলে ঢাকার বায়ু আবারও অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছাতে দেরি হবে না।
পতাকানিউজ/এনটি

