আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাজার রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর প্রতিবাদে এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দলটি ১৩ নভেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। কয়েক দিন ধরেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলের পক্ষ থেকে রাজধানী ও অন্যান্য এলাকায় ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিনটি ঘিরে প্রচার-অপপ্রচারও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৩ নভেম্বরের দিন সরাসরি জনমনে কোনো বিশেষ আশঙ্কা নেই। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশি জোরদার করেছে এবং দেশের সব বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের মধ্যেও উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিএনপি, জামায়াতসহ সরকারের পক্ষের বিভিন্ন দলও আওয়ামী লীগের কর্মসূচি প্রতিহত করতে মাঠে অবস্থান নেবে। জুলাই ঐক্য ১৩ নভেম্বর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি মূলত আলোচনায় আসা এবং রাজনৈতিক প্রভাব দেখানোর কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের ধারণা, এই কর্মসূচি নিজে সফল হবে না, তবে অন্তর্বর্তী সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ব্যস্ত রাখতে এবং আন্তর্জাতিকভাবে নজর আকৃষ্ট করতে এটি কার্যকর হবে।
দেশত্যাগ করা কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, সরকারের বাধার কারণে দেশেই কর্মী-সমর্থকরা তেমন সুযোগ পাবে না। তবে সরকারের কঠোর অবস্থান, হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম ভিডিওতে তুলে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, কর্মী-সমর্থকদের সক্ষমতা ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করাও এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
এক নেতা বলেন, ‘আমরা ধরেই নিয়েছি এ কর্মসূচি ব্যর্থ হবে। দেশে থাকা কর্মী-সমর্থকরা তেমন সুযোগ পাবেন না। সরকারি বাধার মুখে পড়বেন তারা। হামলা-মামলা, মারামারি ও গ্রেপ্তার হবেন। মারমুখী অবস্থানে থাকবে সরকারের বাহিনী।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ওইদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
রাস্তার পাশে জ্বালানি তেল বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন, এই তেল দিয়ে অনেক সময় নাশকতা সংঘটিত হয়, যেমন বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাদ আলী জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং রাজধানীতে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। ১ অক্টোবর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ৫৫২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়কালে ১৫–১৭টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং দুদিনে ৯টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দুদিনের মধ্যে সোমবার ভোর থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত ২০টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং চারটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এই নাশকতার ঘটনায় ঢাকাবাসী সরকারের দেওয়া আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছে না।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী দল। তাদের আর এ দেশের মানুষ ক্ষমা করবে না। ভারতে বসে এ দেশে সন্ত্রাসী দিয়ে গাড়ি পোড়াবে, দেশের সম্পদ নষ্ট করবে আর বাংলাদেশে ফিরে আসবে? সাহস থাকলে আসো, জনগণের সামনে আসো। খালেদা জিয়া জেলে ছিলেন ৬ বছর। আপনি (শেখ হাসিনা) আসেন, জেলে থাকেন ৭-৮ বছর।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ১৩ নভেম্বর সামনে রেখে আওয়ামী লীগ এক ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম করার চেষ্টা করছে। বাসে আগুন দিয়েছে। একজনকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে ডেমরা এলাকায়, তার বাড়ি গোপালগঞ্জে। এছাড়া ময়মনসিংহে একজন বাসচালককে ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। সবগুলো নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কাজ।
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ১৩ নভেম্বর প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য ঐকমত্য তৈরি হওয়ার মুহূর্তে একটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ১৩ নভেম্বর নতুন নাশকতার পরিকল্পনার বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করতে আমরা সমাবেশ করেছি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) দেশের সব বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতা নিশ্চিত করেছে। শাহজালাল বিমানবন্দর কার্গো হাউজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে সিসিটিভি নজরদারি, টহল বৃদ্ধি, মনিটরিং ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেবিচকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেছেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সকলকে সচেতন থাকার পাশাপাশি নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।’
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ জাতীয় প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছে। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু, রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ও চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, দেশের মুক্তিকামী জনগণ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ১৮ বছরের দুঃসহ ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে নাশকতা, চোরাগোপ্তা হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সন্তোষজনক নয়। ছাত্রসংসদ নেতারা জোর দিয়েছেন, ফ্যাসিবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।
পতাকানিউজ/এনটি

