চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত বে টার্মিনাল ২০৩০ সালের মধ্যে অপারেশনে যাবে বলে জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মুনিরুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘এই টার্মিনাল চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আমদানি–রপ্তানিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।’
সোমবার, ৩ নভেম্বর সকালে বন্দর অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘জেনারেল মার্কেট এনগেজমেন্ট কনফারেন্স ফর দ্য বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (BTMIDP)’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বে টার্মিনাল শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। টার্মিনাল চালু হলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা দ্বিগুণ হবে এবং জাহাজ আগমনের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।’
চেয়ারম্যান জানান, বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের নকশা ও প্রস্তুতিমূলক কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দেশি–বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শেষ হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর কাওছার রশিদ বলেন, ‘প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে।’
তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে বে টার্মিনাল সময়ের দাবি। প্রকল্পের আওতায় সাগরে ব্রেকওয়াটার, নেভিগেশন চ্যানেল, কনটেইনার ইয়ার্ড, রেল ও সড়ক সংযোগ এবং আধুনিক জেটি অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, টার্মিনাল চালু হলে বছরে ৩০ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে, যা বর্তমান সক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ।
বে টার্মিনালটি নির্মিত হবে চট্টগ্রামের হালিশহর ইপিজেডের পেছন থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাশমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৬.৫ কিলোমিটার উপকূলে। সাগরের ভেতরে প্রায় ২৩০০ একর জায়গায় গড়ে উঠবে আধুনিক এই টার্মিনাল।
এখানে জোয়ার–ভাটা, ড্রাফট বা সময়সীমার কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। ফলে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ চলাচল করা যাবে।
বর্তমান কর্ণফুলী চ্যানেলে যেখানে ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ প্রবেশ করতে পারে বে টার্মিনালে ১৩ মিটার ড্রাফট ও যে কোনো দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভিড়তে পারবে।
বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে।প্রকল্পের আওতায় তিনটি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করবে পিএসএ সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ড (দুবাই) একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চেয়ারম্যান জানান, পিএসএ সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ড (দুবাই) এবং মাল্টিপারপাস টার্মিনালে মিলিয়ে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
বে টার্মিনাল প্রকল্পের সূচনা ২০১৩ সালে হলেও ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয় ২০১৪ সালে। একনেক অনুমোদন ও অর্থায়নের পরও প্রকল্পের কাজ মাঠে নামতে পারেনি প্রায় এক যুগ। ২০১৭ সালে প্রথম দফায় ৬৭ একর এবং পরে আরও ৫০০ একর ভূমি বরাদ্দ পাওয়া যায়, তবে এখনও ৩০৩ একর জমি অধিগ্রহণ বাকি রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘প্রকল্পের ডিটেইলড ডিজাইনের কাজ চলছে। সেটি শেষ হলেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হবে। আশা করছি, এ বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরুতে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’
বন্দর সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বে টার্মিনাল চালু হলে বছরে ৫০ লাখ টিইইউ পর্যন্ত কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা প্রায় ৩২ লাখ টিইইউ।
বে টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম লজিস্টিক হাবে পরিণত হবে। দেশের শতবর্ষী বন্দর ব্যবস্থাপনায় এটি হবে আগামীর বন্দর এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা।
পতাকানিউজ/এএস/আরবি

