দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধ শেষে গাজায় যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হলেও, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা এখনো দুঃস্বপ্ন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত এ উপকূলীয় উপত্যকায় মানুষ এখনো খুঁজে ফিরছে বসবাসের জায়গা, পানির ফোঁটা আর খাবারের যোগান।
গাজা সিটির প্রাক্তন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নূর আবেদ সাইকেল চালিয়ে নিজের পুরোনো ঠিকানা খুঁজে ফিরছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিচিত এলাকা এখন বালুর টিলায় পরিণত। ‘এখানে বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই,’ বললেন ৩৫ বছর বয়সী আবেদ। ‘না আছে পানি, না বিদ্যুৎ, না স্কুল—এমনকি ফোন নেটওয়ার্কও প্রায় নেই।’
আবেদ এখন আশ্রয় নিয়েছেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে, যেখানে তাঁরা তাবু ফেলেছেন শরণার্থীদের সঙ্গে। পরিবারের সবাই এখনো ফিরে আসেননি; যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কিনা, তা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ।
‘আমরা অপেক্ষা করছি, নিশ্চিত হতে চাই যুদ্ধ সত্যিই শেষ হয়েছে কিনা,’ বললেন আবেদ। ‘কিছু রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছে, জীবন একটু একটু করে ফিরছে—তবে সেটা এখনো খুবই সীমিত।’
ধ্বংসের মাঝে অনিশ্চয়তা
গাজায় যুদ্ধবিরতির এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখানকার পরিস্থিতি জটিল। হামাসের অবশিষ্টাংশ, প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী, গ্যাং ও মিলিশিয়ারা ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে। তবে গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় এবং পানির মতো মৌলিক চাহিদাগুলোই এখন সবচেয়ে জরুরি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি টিকে গেলেও পুনর্গঠনের কাজটি অত্যন্ত কঠিন। প্রায় প্রতিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় ৬৮ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ। গাজার আনুমানিক ২২ লাখ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি শিশু, যারা গত দুই বছর ধরে স্কুলে যেতে পারেনি। খাদ্য এখনো দুর্লভ, এবং যুদ্ধবিরতির পর সাহায্যের পরিমাণ বাড়লেও এর সুশৃঙ্খল বণ্টনের জন্য কোনো কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। এ সপ্তাহে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের ভয়াবহ দৃশ্যগুলো আইনশৃঙ্খলার আরও অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ধ্বংসের পরিমাণ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা ইসরায়েলে হামলা চালায়, যাতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত ও ২৫০ জনকে অপহরণ করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েলের নির্মম প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ইসরায়েলের আক্রমণে গাজার বেশিরভাগ জনগণ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ঘোষিত ‘মানবিক অঞ্চল’-এ পালিয়ে যেতে হয়েছে।
দুই বছরের ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে গাজা এখন অচেনা। ওয়াশিংটন ডিসির দ্বিগুণ আয়তনের এই অঞ্চলের জনসংখ্যা তিনগুণ বেশি। এখন এর ৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে, যা আধুনিক ইতিহাসে বিরল। জাতিসংঘের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, যুদ্ধের প্রথম পাঁচ মাসে ইসরায়েল গাজায় ২৫ হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরক ফেলেছে, যা দুটি পারমাণবিক বোমার সমতুল্য। গত বছরে ইসরায়েল বায়ু ও স্থল আক্রমণ আরও তীব্র করে।
জাতিসংঘের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজার অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা অকেজো, রাস্তায় নর্দমার পানি জমে আছে। কৃষিজমি ধ্বংস করা হয়েছে, যা চাষাবাদ অসম্ভব করে তুলেছে। কিছু এলাকায় বিষাক্ত দূষণের ঝুঁকি রয়েছে। যুদ্ধবিরতির ফলে গাজার মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, সামনের চ্যালেঞ্জের বিশালতা তাদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।

পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ
গাজা সিটির বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু সামরা তার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি মেরামতের চেষ্টা করছেন। ভাঙা দেয়ালগুলো ছাদের একাংশকে কোনোমতে ধরে রেখেছে। ৩৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বাড়ির একটি ছোট্ট অংশ পরিষ্কার করার জন্য পানি খুঁজছেন, কারণ ‘তাঁবুতে থাকার চেয়ে এটাও ভালো।’ তবে তিনি তার প্রতিবেশীদের এখনো ফিরে না আসার পরামর্শ দিয়েছেন।
“এখন গাজায় নিরাপত্তা আছে, শান্তি ও নিরাপদ পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য সবচেয়ে সাধারণ জিনিসগুলো- পানি, নর্দমা ব্যবস্থা, বাজার- কিছুই নেই,’ তিনি সিএনএনকে বলেন।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় অন্তত ৬৭ হাজার ৯৩৮ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিশু। এই সংখ্যায় কেবল তাদেরই ধরা হয়েছে, যাদের মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গাজার সিভিল ডিফেন্সের মতে, অন্তত ১০ হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ এবং হাজার হাজার অবিস্ফোরিত ইসরায়েলি গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার কাজ আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) অনুমান করেছে, গাজার পুনর্গঠনের প্রথম পর্যায়ে ৫৫ মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করতে হবে, যা গিজার ১৩টি পিরামিডের সমতুল্য। ইউএনডিপির জ্যাকো সিলিয়ার্স এনপিআর-কে বলেন, ‘সেন্ট্রাল পার্কের চারপাশে ১২ মিটার উঁচু দেয়াল তৈরি করে তা ভর্তি করার সমান ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে হবে। এর মধ্যে অবিস্ফোরিত বোমাও রয়েছে, যা প্রথমে অপসারণ করতে হবে।’
যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি ও অনিশ্চয়তা
যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম পর্যায় প্রায় শেষের পথে। হামাস বাকি ২০ জন জীবিত জিম্মিকে ফিরিয়ে দিয়েছে, এবং ২৮ জন মৃত জিম্মির দেহ ফেরত দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। ইসরায়েলের অভিযোগ, হামাস দেহ ফেরত দিতে টালবাহানা করছে, তবে একজন মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, হামাস চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেনি। ইসরায়েল ২৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে, যারা গুরুতর অপরাধে দোষী ছিলেন, এবং যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অভিযোগ ছাড়া আটক ১ হাজার ৭০০ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনির দেহ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট। ট্রাম্পের ২০-দফা প্রস্তাবে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার শাসনভার একটি ফিলিস্তিনি কমিটির হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা একটি আন্তর্জাতিক বোর্ড তদারকি করবে। ইসরায়েলকে গাজার বেশিরভাগ অংশ থেকে সরে যেতে হবে, তবে এটি একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের পর।
এই নিরাপত্তা বাহিনী এখনো গঠিত হয়নি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই বাহিনী ‘গঠনের প্রক্রিয়ায়’ রয়েছে। মিশর, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও আজারবাইজান এতে অংশ নিতে প্রস্তুত। মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তির পরবর্তী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে, তবে এটি ‘ধৈর্যের’ সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ সময় নেবে।

হামাসের পুনঃউত্থান
শারম আল-শেখে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও গাজায় নিরাপত্তার শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। হামাস এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে রাস্তায় শক্তি প্রদর্শন শুরু করেছে। সিএনএন’র যাচাইকৃত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হামাসের বন্দুকধারীরা গাজা সিটিতে আটজন চোখ বাঁধা ব্যক্তির প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডকে ‘নিরাপত্তা অভিযান’ হিসেবে প্রশংসা করেছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো মুহাম্মদ শেহাদা বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির পর হামাস দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তারা এই মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, যাতে অন্যরা তাদের বিরুদ্ধে না যায়।’
ট্রাম্প এই বিষয়ে কিছুটা সমর্থন দিয়েছেন বলে মনে হয়। ইসরায়েল সফরের পথে তিনি বলেন, হামাস ‘সমস্যা বন্ধ করতে’ চায় এবং তিনি তাদের ‘কিছু সময়ের জন্য’ অস্ত্র সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছেন। তবে পরদিন তিনি সতর্ক করে বলেন, হামাসকে নিরস্ত্র না হলে ‘আমরা তাদের নিরস্ত্র করব।’
পুনর্গঠনের জন্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ মূল্যায়ন অনুসারে, গাজার পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। প্রথম ৩ বছরে স্কুল, কারখানা ও হাসপাতাল পুনর্নির্মাণের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। গাজার জনগণ এখনো ত্রাণের উপর নির্ভরশীল, কারণ ইসরায়েল অঞ্চলটির উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস ও দখল করেছে।
আগস্টে জাতিসংঘ-সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) গাজা সিটির কিছু অংশে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে, যা বিশ্বব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি করে। যুদ্ধবিরতির পর ত্রাণের প্রবাহ বেড়েছে, তবে জাতিসংঘ বলছে, এটি ‘সমুদ্রে এক ফোঁটা’ মাত্র। প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা থাকলেও এটি চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
মানবিক ট্র্যাজেডি
মোনা খলিলের ছেলে ফালাফেল কিনতে যাওয়ার পথে ড্রোন হামলায় নিহত হয়। ‘আমি ঈশ্বরের কাছে একটি ছেলের জন্য প্রার্থনা করেছিলাম, কিন্তু সে বেশিদিন আমার কাছে ছিল না,’ তিনি সিএনএন-কে বলেন। ‘যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু ফিরে এলে আসুক। আমার ছেলে চলে গেছে। আমি কী পেলাম?’
গাজার ধ্বংসস্তূপের মাঝে জীবন ফিরে আসার চেষ্টা করছে, তবে পুনর্গঠন, নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের বিশালতা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
পতাকানিউজ/এনটি

