আজ থেকে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে নতুন বাংলাদেশের। গণতন্ত্রের ডুবন্ত তরী আজ তীর খুঁজে পেয়েছে। পেয়েছে মহাসড়কের দেখা। সেই মহাসড়কে বাংলাদেশের গাড়ি চালানোর চালকও খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ। চালক তারেক রহমান। বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দম্পতির বড় সন্তানের হাতেই উঠল বাংলাদেশ পরিচালনার চাবি।
চালকের আসনে বসার আগে তারেক রহমানসহ বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। এরপর সংসদীয় দলের সভায় বসেন তাঁরা। সেই সভায় সর্বসম্মতভাবে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তারেক রহমান। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পাবে নতুন প্রধানমন্ত্রী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ‘ডুবিয়ে’ ভারতে পালিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী পালানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ নেতা হারায়। এরপর বাংলাদেশকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব দেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই থেকে গণতন্ত্রে ফেরানোর জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে গেছে।
সবশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায় বিএনপি। ফলে এককভাবে সরকার গঠন করছে বিএনপি। সেই সরকারের নেতা তারেক রহমান।
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পরপরই চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বিএনপি। সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট নেবেন না। এর মাধ্যমে নতুন বার্তা দিয়েই ইনিংস শুরু করলেন তারেক রহমান। অবশ্য এর আগেই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, প্রথা ভেঙে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে শপথ নেবেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা। তারেক রহমানের এসব সিদ্ধান্ত ব্যতিক্রমী হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
আজ দুপুর থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করানোর মাধ্যমে গণতন্ত্রের গাড়িকে চলার উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন সংসদ অকার্যকর থাকার পর আজ থেকে সংসদে নতুন আলো প্রজ্জ্বলন শুরু হতে যাচ্ছে। আর বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ বাক্য পাঠ করাবেন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের গাড়ি গতি পাবে।
এই শপথ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি অন্তত ১২০০ অতিথি উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছেন।
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা কারা
সেই বিষয়ে সাধারণ মানুষের অধীর আগ্রহ থাকলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বিষয়ে তথ্য স্পষ্ট করেনি বিএনপি। তবে সংসদ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে গণমাধ্যমে খবর আসতে শুরু করে মন্ত্রী পদে যারা শপথ নেওয়ার ডাক পেয়েছেন তাদের নাম। তারপরও চূড়ান্ত তালিকা পেতে শপথ গ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এরপর দপ্তর বণ্টনের বিষয়টি জানা যাবে।
ইতোমধ্যেই মন্ত্রিপরিষদে ডাক পেয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ৪. ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু), মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আবদুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, মিজানুর রহমান মিনু, নিতাই রায় চৌধুরী, ১২. খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম (রিতা), শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সরদার সাখাওয়াত হোসেন (বকুল), ফকির মাহবুব আনাম (স্বপন) ও শেখ রবিউল আলম।
এছাড়া প্রতিমন্ত্রী পদে ডাক পেয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মো. শরিফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশীদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আব্দুল বারী, মীর শাহে আলাম, জোনায়েদ সাকি, ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, নুরুল হক, ইয়াসের খান চৌধুরী, এক ইকবাল হোসেইন, এম এ মুহিত, আহমেদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।
নতুন যাত্রার প্রত্যাশা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপি বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েছে এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। পরে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে।
ইতোমধ্যে তারেক রহমান জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। এতে বিভিন্ন মহলে আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে বড় সুযোগ এসেছে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভায় সৎ, দক্ষ ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি কতটা হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন সরকারের যাত্রাকে ঘিরে রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদ নেতা ও সংসদ উপনেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় থাকলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে আবদুল মঈন খানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
ফিরেছে অতীত স্মৃতি
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি—তারেক রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, তখন অনেকের স্মৃতিতে ফিরে আসছে বাংলাদেশ ও বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি বছর—১৯৭৯ ও ১৯৯১।
৪৬ বছর আগে ১৯৭৯ সালের ১৬ এপ্রিল তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে দেশকে বের করে বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারায় ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তিনি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেন। তাঁর মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৪২ জন।
এরপর ৩৪ বছর আগে ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তাঁর মা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁকে শপথ পড়ান। সে সময়ের মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৩১ জন। পরে ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় সদস্য সংখ্যা ছিল ৬০ জন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা ও প্রত্যাশার মধ্যেই নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার একটি দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কীভাবে শুরু করে—তার প্রতিফলন অনেকটাই স্পষ্ট হবে নতুন মন্ত্রিসভার গঠন ও চরিত্রে।
নতুন বাংলাদেশের চালক তারেক রহমান এবং তাঁর সারথীরা নতুন বাংলাদেশকে কীভাবে পরিচালনা করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
-পতাকানিউজ

