চীনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলন ও সামরিক কুচকাওয়াজে যে বার্তা উঠে এসেছে, তা শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই—বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্দেশে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মস্কো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, কারণ তার শক্তিশালী বন্ধু রয়েছে।
চীনের রাজধানীতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানগুলোতে পুতিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ালেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে রাশিয়ার জন্য চীনের ও ভারতের আর্থিক সহায়তা, ইরানের অস্ত্র এবং উত্তর কোরিয়ার সীমিত মানবসম্পদ ছিল অপরিহার্য।
তবে চীনের এ কূটনৈতিক প্রদর্শনী শুধু ইউক্রেন যুদ্ধ নয়, বরং পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার বৈশ্বিক প্রচেষ্টারই প্রতিফলন।

পশ্চিমা আধিপত্য ভাঙার সুযোগ
এই দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থাকলেও তারা এখন একটি অভূতপূর্ব সুযোগ দেখছে—দীর্ঘদিনের পশ্চিমা প্রভাব ভেঙে নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। ইউরোপ ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, এর প্রভাব সরাসরি তাদের নিরাপত্তার ওপর পড়তে পারে।
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বৈশ্বিক মঞ্চ থেকে সরে আসছে, অন্যদিকে ইউরোপ নিজেই চরম ডানপন্থার উত্থান ও অর্থনৈতিক চাপে ভুগছে। এই সুযোগে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরান ও উত্তর কোরিয়া নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
ব্রিটিশ থিংক ট্যাঙ্ক নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিজ সেন্টারের প্রধান জন লাফ বলেন, পশ্চিমাদের একক প্রভাব কমছে, আর এই দেশগুলো এখন নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রকৃত সুযোগ দেখছে।

চীন-ভারতের বাস্তববাদী কূটনীতি
চীন ও ভারত প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিষয়ে নিরপেক্ষতা দেখালেও বাস্তবে তারা রাশিয়াকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন রুশ তেল বাজার হারাচ্ছিল, তখন চীন ও ভারত এগিয়ে এসে সস্তায় তেল কিনে নিল। এতে মস্কো অর্থনৈতিক লাইফলাইন পেল, আর দুই দেশ পেল সস্তা জ্বালানি।
এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীনা ও ভারতীয় কোম্পানিগুলো রাশিয়াকে ‘ডুয়াল-ইউজ’ প্রযুক্তি সরবরাহ করছে—যেমন চিপস বা টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি—যা সামরিক খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাশিয়ার তৈরি ড্রোনে প্রচুর চীনা যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা
ইরান যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়াকে সহায়তা দেয়। বিশেষত ‘শাহেদ’ ড্রোন সরবরাহ করে মস্কোর যুদ্ধকৌশল পাল্টে দেয়। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় রাশিয়ার নীরবতা তেহরানকে দেখিয়ে দিয়েছে—এ সম্পর্কেরও সীমাবদ্ধতা আছে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে সম্পর্কটি পুরোপুরি লেনদেনভিত্তিক। রাশিয়ার দরকার জনবল, আর কিম জং উন রাজনৈতিকভাবে সেনা পাঠাতে পারেন কোনো অভ্যন্তরীণ চাপ ছাড়াই। ফলে দুই দেশের এই সহযোগিতা এক ধরনের ‘প্রয়োজনের জোট’।
ইউরোপের নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনা
চীনে পুতিনের উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং সামরিক প্রদর্শনী ইউরোপের কাছে নতুন বাস্তবতা হাজির করেছে। যুদ্ধের শুরুতে ইউরোপকে অপ্রস্তুত মনে হলেও এখন তারা প্রতিরক্ষা খাতে বড় পরিবর্তন এনেছে। জার্মানি সংবিধান বদলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে, আর নিরপেক্ষ নীতির দেশ সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ইতিমধ্যে ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই নতুন জোটগুলো মূলত পারস্পরিক স্বার্থকেন্দ্রিক, আন্তরিক বন্ধুত্ব নয়। অর্থাৎ পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে এ সম্পর্ক ভেঙেও যেতে পারে। লাফ বলেন, ‘এটি দেশগুলোর জোট নয়, বরং স্বার্থের জোট। আর স্বার্থ বদলাতে বেশি সময় লাগে না।’
সব মিলিয়ে, চীনের সম্মেলন ও কুচকাওয়াজ শুধু আঞ্চলিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের সামনে এখন প্রশ্ন—তারা কি নতুন এই বাস্তবতায় নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারবে?
পতাকানিউজ/এনটি

