ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাস ও মিনিবাসের নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এবং ঢাকার আশপাশের জেলা রুটের পাশাপাশি আন্তজেলা ও দূরপাল্লার সব রুটের জন্য আলাদা ভাড়ার হার নির্ধারণ করা হয়েছে নতুন তালিকায়।
বিআরটিএ জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সরকার সব ধরনের বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সিদ্ধান্ত একই দিন থেকেই কার্যকর করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভাড়ার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়।
নতুন তালিকায় বলা হয়েছে, রাজধানী ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। কোনো অবস্থাতেই এই ভাড়ার নিচে যাত্রী থেকে অর্থ আদায় করা যাবে না। একই সঙ্গে গ্যাসচালিত বাসের ক্ষেত্রে নতুন ভাড়ার হার কার্যকর হবে না বলে জানানো হয়েছে।
বিআরটিএ আরও জানিয়েছে, ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভগ্নাংশ হিসাব থাকলে ৫০ পয়সার বেশি হলে তা ১ টাকা হিসেবে যোগ হবে। আর ৫০ পয়সার কম হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না এবং বাদ যাবে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার জন্য প্রতি কিলোমিটার বাসভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে এই হার অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, রাজধানীর ফুলবাড়িয়া বা গুলিস্তান থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সাড়ে ৪১ কিলোমিটার পথে মোট ভাড়া দাঁড়াবে ১০৫ টাকা। একই পথে ফুলবাড়িয়া থেকে মগবাজার পর্যন্ত সর্বনিম্ন ১০ টাকায় যাতায়াত করা যাবে। তবে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া কিলোমিটার অনুযায়ী যুক্ত হবে।
ঢাকার অভ্যন্তরীণ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে শ্যামলী, আসাদ গেট, ফার্মগেট ও প্রেসক্লাব হয়ে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার পর্যন্ত মোট দূরত্ব ২১ কিলোমিটার। এই রুটে সম্পূর্ণ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ টাকা। একই সঙ্গে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ভাড়া ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। চিড়িয়াখানা থেকে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত ভাড়া ১০ টাকা, শ্যামলী পর্যন্ত ১৪ টাকা এবং ১০ টাকা দিয়ে শ্যামলী থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত যাতায়াত করা যাবে।
চট্টগ্রাম মহানগরেও একই ভাড়ার কাঠামো কার্যকর হবে। কালুরঘাট ব্রিজ থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার পথে মোট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ টাকা। এই রুটে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। ফলে চকবাজার মসজিদ থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত ১০ টাকায় যাতায়াত করা যাবে। একইভাবে কালুরঘাট ব্রিজ থেকে শরাফত পেট্রলপাম্প পর্যন্ত যেকোনো স্বল্প দূরত্বে ভাড়া ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নিউমার্কেট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার পথে ভাড়া দাঁড়াবে ৪৭ টাকা। এ রুটে স্বল্প দূরত্বে নিউমার্কেট থেকে বাদামতলী পর্যন্ত ১০ টাকায় যাতায়াত করা যাবে বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ২৩ পয়সা, যা ৫১ আসনের বাসের জন্য প্রযোজ্য। তবে দূরপাল্লার অনেক পরিবহন ৪০ আসনের বাস ব্যবহার করে থাকে, যেখানে আসন কমিয়ে আরামদায়ক সেবা দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি ভাড়া তুলনামূলকভাবে বেশি হবে।
দূরপাল্লার রুটে ফেরি ও সেতুর টোলও ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিআরটিএ বলছে, সব টোল ও অতিরিক্ত ব্যয় মিলিয়েই নতুন ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ২৪২ কিলোমিটার পথে টোল বাবদ ৪৫০ টাকা যুক্ত করা হয়েছে। এই রুটে ৫১ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫২ টাকা। আর ৪০ আসনের বাসে ভাড়া দাঁড়াবে ৭০৪ টাকা।
সায়েদাবাদ থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার পথে ৫১ আসনের বাসে ভাড়া ২৪০ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে সায়েদাবাদ থেকে সিলেট পর্যন্ত ২৫৭ কিলোমিটার পথে ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৫৮০ টাকা এবং ৭৪০ টাকা।
ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট হয়ে বরিশাল পর্যন্ত ২৪২ কিলোমিটার পথে ফেরি টোলসহ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এই রুটে ৫১ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি টোল যুক্ত হচ্ছে ৭৬ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ৯৭ টাকা। ফলে মোট ভাড়া দাঁড়াচ্ছে যথাক্রমে ৬১৬ টাকা এবং ৭৮৫ টাকা।
অন্যদিকে, সায়েদাবাদ থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বরিশাল পর্যন্ত ১৭১ কিলোমিটার পথে পদ্মা সেতু, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও অন্যান্য টোল মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার টাকার কাছাকাছি টোল যুক্ত হচ্ছে। এতে প্রতি যাত্রীর ওপর ৫১ আসনের বাসে ৮৩ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ১০৬ টাকা বাড়তি টোল যুক্ত হবে। এই রুটে মোট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬৪ টাকা (৫১ আসন) এবং ৫৯২ টাকা (৪০ আসন)।
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ১১৬ কিলোমিটার পথে কোনো টোল নেই। এই রুটে ৫১ আসনের বাসে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫৯ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ৩৩০ টাকা।
মহাখালী থেকে রাজশাহী ও রংপুর রুটে যমুনা সেতুসহ বিভিন্ন সেতুর টোল যুক্ত হওয়ায় ভাড়া তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে। এই রুটে শুধু যমুনা সেতুর টোলই ১ হাজার টাকা। ফলে মহাখালী থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ২৬৭ কিলোমিটার পথে ৫১ আসনের বাসে ভাড়া ৬২৫ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ৭৯৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মহাখালী থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার পথে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০১ টাকা (৫১ আসন) এবং ২৫১ টাকা (৪০ আসন)।
চট্টগ্রাম মহানগর থেকে বিভিন্ন জেলা রুটেও একই কিলোমিটার ভিত্তিক ভাড়া কার্যকর হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ফেনী হয়ে সোনাপুর পর্যন্ত ১৪৭ কিলোমিটার পথে ৫১ আসনের বাসে ভাড়া ৩২৮ টাকা এবং ৪০ আসনের বাসে ৪১৮ টাকা। একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ১৫৪ কিলোমিটার পথে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪৩ টাকা এবং ৪৩৭ টাকা।
বিআরটিএ জানিয়েছে, নতুন ভাড়া কাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সামাল দেওয়া এবং পরিবহন খাতে একটি সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ ভাড়া ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই সরকারের লক্ষ্য।
–পতাকানিউজ

