নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নিতে যাওয়া নতুন সরকার কোনো স্বস্তিদায়ক অর্থনীতি পাচ্ছে না। বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির ভার নিয়েই ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে তারা। অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন বলছে, শুরুতেই নতুন সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে—যেখানে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সংস্কার চাপ।
বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে নতুন সরকারের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সহজ হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে বিনিয়োগে অচলাবস্থা
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হতে পারে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে এবং নতুন শিল্প স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি কাটাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।
তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাড়তি ব্যয় ও কম আয়—দ্বিমুখী চাপ
নির্বাচিত সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাড়তি রাজনৈতিক ব্যয় সামাল দেওয়া। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নসহ নানা প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকারের ব্যয় বাড়বে। কিন্তু রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়বে এবং এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে সুদের হার বৃদ্ধি ও বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হতে পারে।
সুদের হার কমবে না, ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ
ব্যবসায়ী মহল ঋণের সুদের হার কমানোর দাবি তুললেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে থাকায় আইএমএফও সুদের হার কমানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত সুদের হার কমানো উচিত নয়।
ফলে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ও রাজস্ব সংকট
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতিতে মন্দা চলছে, যা রাজস্ব আয়কে বাধাগ্রস্ত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে এবং রাজস্ব বোর্ড সংস্কার প্রক্রিয়ায় অস্থিরতার কারণে আয় কমেছে।
তিনি বলেন, আয় কমলেও সরকারি ব্যয় বেড়েছে, ফলে বাজেট ঘাটতি বাড়ছে এবং সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির নতুন চাপের আশঙ্কা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচন, রমজান ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়াবে। এতে চাহিদা বাড়ার ফলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
এদিকে আইএমএফ ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার সুপারিশ করছে। এতে টাকার মান কমে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে পারে বলে সংস্থাটির ধারণা।
ব্যাংকিং খাতেও বড় ঝুঁকি
নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ব্যাংকিং খাত। অতীতের ঋণ কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে সংস্কার উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইএমএফের সংস্কার চাপ ও সম্ভাব্য জনঅসন্তোষ
আইএমএফ ভর্তুকি কমানোসহ বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে পারে, যা নতুন সরকারের জন্য জনঅসন্তোষের কারণ হতে পারে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক আশা করছে অবস্থার পরিবর্তন হবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে বাজারে নতুন চাহিদা সৃষ্টি হবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে হলে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি।
আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফিরতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স বাড়ানো এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির আস্থার সংকট কাটিয়ে রাজস্ব আয় বাড়াতে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ স্বাভাবিক করতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে। সেই সময় পর্যন্ত সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত ও অজনপ্রিয় সংস্কারের পথেই এগোতে হতে পারে।
-পতাকানিউজ

