রাত গভীর হলে হারবাং ইউনিয়নের ইছাছড়ি খালপাড়ে শুরু হয় অন্য এক জগত। অন্ধকার ভেদ করে শোনা যায় শ্যালো মেশিনের বিকট শব্দ। পাহাড় ও ফসলী জমি কেটে মাটি ও খাল থেকে বালু উত্তোলনের গর্জন আর ট্রাকের অবিরাম চলাচল। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘এই শব্দ মানেই রাতভর বালু আর মাটি লুটের উৎসব।’
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার এই জনপদে দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল, পাহাড় কেটে মাটি পাচার, খাল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং মাদক ব্যবসার অভিযোগ ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মো. নাজিম উদ্দিন (৪৬)। এই নাজিমের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে ১৪ দিন আগে। কিন্তু সময়ের মধ্যে পুলিশ নাজিম নাগাল খুঁজে পায়নি। পাহাড় খেয়ে বালু লুট করলেও পরিবেশ অধিদপ্তর এখনো হারবাংয়ের ঘটনাস্থলে পরির্দশনের জন্যও পৌঁছতে পারেনি।
স্থানীয়দের দাবি, একসময় গাড়ির হেলপার হিসেবে জীবিকা শুরু করা এই ব্যক্তি এখন কোটি টাকার সম্পদের মালিক। আর সেই উত্থানের পেছনে মাদক ব্যবসা, পাহাড় কাটা, বনভূমি দখল, ফসলী জমি থেকে মাটি বিক্রি এবং অবৈধ বালু ব্যবসার এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
হেলপার থেকে প্রভাবশালী
হারবাং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইছাছড়ি এলাকার মৃত খুইল্যা মিয়ার ছেলে নাজিম উদ্দিন। স্থানীয়দের ভাষ্য, খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, একসময় জীবিকার তাগিদে তিনি গাড়ির হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু ২০১০ সালের পর থেকেই তার জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথমে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি, খাল থেকে বালু উত্তোলন এবং বনাঞ্চলের গাছ পাচারের মতো অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। অল্প সময়েই গড়ে ওঠে তার শক্তিশালী প্রভাববলয়। মাদক (ইয়াবা ও চোলাইমদ) ব্যবসা করতে সুবিধার্থে তার নিজের এক বোন ও এক ভাইকে সঙ্গে রাখেন। সেই বোন রুপাও মাদকসহ আটক হন তিনবার। তার ভাই আজিমের বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক মামলা।
বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, হারবাং এলাকায় বনভূমির প্রায় ১০ থেকে ১২ একর জমি দখল করে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন নাজিম উদ্দিন। দখল করা জমিতে বহুতল বাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। এই সময়ে অবৈধ আয় থেকে ১০ কানির বেশি জমি ক্রয় করেছেন জানিয়েছেন স্থানীরা। তবে প্রভাবশালী বনে যাওয়া নাজিমের বিরুদ্ধে পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে চাননি তারা।
পাহাড় ও ফসলী জমি কেটে মাটি বিক্রির জন্য তার নিজস্ব এস্কেভেটর রয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সেই মাটি পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয় তার নিজের মালিকানাধীন তিনটি ট্রাক ও দুটি ড্রাম ট্রাক ছাড়াও ভাড়া করা অর্ধশতাধিক যানবাহন ।
এই কাজে প্রতিদিন নিয়োজিত থাকে ১৫ থেকে ১৬ জন শ্রমিক। পাহারার জন্য রয়েছে ৮ থেকে ১০ জনের একটি সশস্ত্র দল। এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। তাদের ভাষায়, ‘এই এলাকায় আকাশচুম্বি হয়েছে নাজিমের ক্ষমতার পাহাড়।’

খাল থেকে বালু উত্তোলনের মহড়া
সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হারবাং ইউনিয়নের ‘ভান্ডারির ডেপা ও ইছাছড়ি খাল’ এলাকায় দিন-রাত শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শুধু খালই নয়, আশপাশের ফসলি জমিও রক্ষা পাচ্ছে না। জমি কেটে মাটি ট্রাকে তুলে অন্যত্র পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এতে খালের পাড় ধসে পড়ছে এবং ঝুঁকির মুখে পড়েছে আশপাশের বসতঘর, ফসলি জমি, মসজিদ-মাদরাসা এবং গ্রামীণ সড়ক। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে কয়েকটি গ্রামীণ রাস্তা ধসে পড়েছে। বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
‘ঢেরা’য় সাংবাদিক প্রবেশ নিষেধ
নাজিম উদ্দিনের কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থল এই ‘ঢেরায়’ সাধারণ মানুষের তো দূরের কথা, সাংবাদিকদেরও প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেউ ভিডিও বা ছবি ধারণ করতে গেলে তাকে হামলার শিকার হতে হয়।
সর্বশেষ গত ২২ ফেব্রুয়ারি, চকরিয়ায় কর্মরত তিনজন সংবাদকর্মী কালের কন্ঠের ছোটন কান্তি নাথ, আমার দেশের ইকবাল ফারুক ও দৈনিক সংবাদের এম জিয়াবুল হক বালু উত্তোলনের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তাদের ওপর হামলার চালায়।
এতে ছোটন মাথায়, ইকবাল হাতে ও বুকে এবং জিয়াবুল কনুইতে গুরুতর জখম হয়। ইকবালের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। তিনি বর্তমানে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ওইসময় পানিতে দুই মিনিট চুবিয়ে রেখে ছোটন কান্তিকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয় বলে তিনি নিজেই দাবী করেছেন।
এছাড়া মারধরের পরও তাদেরকে একটি গোপন ঢেরায় দুই ঘন্টা আটকে রাখা হয় এবং পরে নিজস্ব লোক দিয়ে লোহাগাড়ার একটি বেসরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের দাবী। এঘটনায় সাংবাদিক ইকবাল ফারুক বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখপূর্বক চকরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে নাজিম উদ্দিনকে। পর্যন্ত ঘটনার পর ১৪ দিন অতিবাহিত হলেও ৮ মার্চ পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশের দাবী অভিযুক্তরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় অভিযানে গেলেও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।

আতঙ্কে একটি জনপদ
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘হারবাং এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না।’এলাকাবাসীর অভিযোগ, নাজিম উদ্দিন ও তার ভাই শাহাব উদ্দিন সশস্ত্র পাহারায় এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ফলে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাজিম উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সাংবাদিকদের মারধরের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, ঘটনা শুনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ওইসময় আমাদের উপস্থিতির আগেই বালু ও মাটি উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যায়। সেখান থেকে একটি শ্যালো মেশিনসহ বালু উত্তোলনের বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করেছি।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, ঘটনাটি কয়েকদিন আগে জেনেছি। শীঘ্রই সরেজমিন পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
-পতাকানিউজ/ এমজেসি

