জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই নির্বাচনী আচরণবিধির বৈপরীত্য, বাস্তবায়ন–সক্ষমতার ঘাটতি এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গতকাল বুধবার নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী সংলাপে আমন্ত্রিত রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি অভিযোগ তোলে যে, আচরণবিধির বিভিন্ন বিধান নিজেরাই একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ফলে মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। দলগুলোর মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নির্বাচন কমিশন নিয়ম তৈরির চেয়ে বাস্তবায়নেই পিছিয়ে আছে।
সংলাপে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন দল আচরণবিধির একাধিক ধারাকে ‘অব্যবহারযোগ্য ও সাংঘর্ষিক’ বলে উল্লেখ করে। তাদের অভিযোগ—পোস্টার নিষিদ্ধ করে আবার একই আচরণবিধিতে পোস্টার অপসারণ না করার বাধা তৈরি করা হয়েছে; শাস্তির বিধান থাকলেও কে শাস্তি দেবে, সেটাই পরিষ্কার নয়; শব্দনিয়ন্ত্রণ, প্রচারসামগ্রী, মাইক ব্যবহারের মতো বাস্তবায়ন–নির্ভর নিয়মগুলো প্রয়োগে ইসির সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট।
জামায়াতের আইনজীবীরা প্রশ্ন তোলেন—একদিকে পোস্টার নিষিদ্ধ, অন্যদিকে পোস্টার না ছেঁড়ার বিধান—এসব পরস্পরবিরোধী নির্দেশ মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। দলটির দাবি, এ ধরনের অস্পষ্টতা প্রয়োগে বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি অভিযোগ করেন, নির্বাচনী প্রচার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই বিলবোর্ড–ফেস্টুনে শহর ভর্তি হয়ে গেছে। এগুলো অপসারণ করলে যেসব প্রার্থীর বড় ব্যয়ের সক্ষমতা নেই তারা শুরুতেই অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে যাবে।
বিএনপি সংলাপে স্পষ্ট করে জানায়, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসনের বদলে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হলে নির্বাচন অনেক বেশি নিরপেক্ষ হবে। তাদের বক্তব্য- পেশাজীবী আমলারা প্রশাসনিক আদেশে বারবার বদলি হচ্ছেন, ফলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
জামায়াত আরও একধাপ এগিয়ে প্রশাসনের বদলি প্রক্রিয়ায় ‘চক্রান্ত’ দেখছে। দলটির মতে, ভোটের সময় ঘনিয়ে এলে লটারি পদ্ধতিতে ডিসি–এসপি বদলি করা হলে রাজনৈতিক প্রশ্নের অবসান ঘটবে এবং প্রশাসন নিরপেক্ষতার আস্থায় ফিরবে।
এনসিপি প্রচারণায় দলের প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেয়, বিশেষ করে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান বা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আচরণবিধি প্রয়োগে কঠোরতার দাবি জানায়। তাদের মতে, ইসির সক্ষমতা পরীক্ষা হবে এখানেই।
আরও বড় প্রশ্ন তুলেছেন তরুণ প্রার্থীদের প্রচারে ‘বাস্তব সুযোগ’ নিয়ে—৬০ ডেসিবল শব্দসীমা মাপতে ইসির যন্ত্রপাতি আছে কি না, অস্ত্রবহুল পরিবেশে দুর্বল প্রার্থীদের নিরাপত্তা কেমন থাকবে, সেসব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
বেশ কয়েকটি দল অভিযোগ করে—ইসির সদিচ্ছা থাকলেই আচরণবিধি ঠিকমতো প্রয়োগ হতে পারে। মাঠে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি না হলে আইন শুধু কাগজেই থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেন তারা।
বাংলাদেশ লেবার পার্টি অভিযোগ করে যে, নির্বাচন কমিশন প্রতীক বরাদ্দে স্বাধীনতার জায়গা আগেই হারিয়েছে, এমনকি দলগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছে।
সব অভিযোগ ও পরামর্শ শুনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন জানান—নির্বাচনী আচরণবিধি তৈরি করা কঠিন বিষয় নয়, বরং সেগুলো মেনে চলাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থীরাই নির্বাচনী আচরণবিধি প্রয়োগে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার পরে।
সিইসি বলেন, সব দল গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাই আচরণবিধি মানার ক্ষেত্রে তাদেরই নেতৃত্ব দেখাতে হবে। কেয়ারটেকার সরকারের সময় দলগুলো আচরণবিধি মানতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সংলাপে অংশগ্রহণকারী দলসমূহ
সকালের সেশনে অংশ নেয়:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি।
দুপুরের সেশনে ছিল:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) এবং বাসদ–মার্কসবাদী।
পতাকানিউজ/এনটি

