ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের ভাঙন মেরামতের পথে হাঁটছে বিএনপি। দলটি এখন ঐক্যবদ্ধতার লক্ষ্য সামনে রেখে দীর্ঘদিনের বিভেদ-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সবস্তরের নেতাকর্মীকে এক ছাতার নিচে আনতে চায়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে বহিষ্কৃত নেতাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে তারা। উদ্দেশ্য একটাই—ধানের শীষের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন কারণে বহিষ্কৃত তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অনেকে আবার দলে ফেরার আবেদন করেছেন। তাদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সর্বশেষ রবিবার (৯ নভেম্বর) ৪০ জন নেতার পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ৬০ জনের মতো নেতাকে পুনর্বহাল করা হয়। দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই এই পুনর্বহালের গতি আরও বেড়েছে।
দলীয় দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন। এখন দলীয় অবদান ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা বিবেচনায় এনে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি বলছে, এটি ঢালাও ক্ষমা নয়; প্রতিটি কেস যাচাই-বাছাই করে, আন্দোলনে অবদান ও শৃঙ্খলার মানদণ্ড দেখে সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাদের আবেদনের ভিত্তিতে এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমরা পুনর্বহালের সুযোগ দিচ্ছি। কেউ গুরুতর অপরাধে জড়িত না থাকলে এবং অতীতের অবদান উল্লেখযোগ্য হলে তাদের দলে ফেরানো হচ্ছে। এটি একটি চলমান সাংগঠনিক প্রক্রিয়া।’
দলীয় কৌশলগত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। তাই সংগঠনকে শক্তিশালী করতে এবং মাঠপর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে পুরোনো কর্মীদের ফিরিয়ে আনা এখন কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় কর্মীদের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব কমানো বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন এমন অনেক নেতা, যারা দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলেও নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি ধরে রেখেছিলেন। তাদের অন্যতম খুলনার নজরুল ইসলাম মঞ্জু—যিনি ২০২১ সালে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে অব্যাহতি পান। তবে তিনি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাননি, বরং কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। সম্প্রতি তারেক রহমানের সঙ্গে ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে তিনি আবার দলে সক্রিয় হন। পরে ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় খুলনা-২ আসন থেকে মনোনয়ন পান তিনি। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, তাকেও আবার দলে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু—যিনি ২০২২ সালে আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত হয়েছিলেন—তিনিও দলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। সম্প্রতি গুলশানে বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কুমিল্লা সদর আসনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
দলীয় দপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ৩৬ নেতা এবং সংরক্ষিত আসনের কয়েকজন নারী কাউন্সিলরসহ ৪০ জন নেতার পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতানা রাজিয়াকেও পুনর্বহাল করা হয়েছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আনতে বিএনপি সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছিল। তখনই দলটি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে, যার আওতায় প্রায় সাত হাজার সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এর মধ্যে ৪ হাজারের বেশি বিএনপি নেতা এবং বাকিরা অঙ্গসংগঠনের সদস্য। এখন সেই কঠোর সময় পার করে দলটি আবার ঐক্যের পথে ফিরছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানো বিএনপির জন্য শুধু একটি সাংগঠনিক সমন্বয় নয়, এটি নির্বাচনী যুদ্ধের কৌশলও। কারণ, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ও প্রভাবশালী নেতাদের পুনরায় যুক্ত করতে পারলে ধানের শীষের পক্ষে ভোটযুদ্ধ অনেকটাই সহজ হতে পারে।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে বিএনপি বুঝতে পারছে—ভেতরের বিভেদ যতদিন থাকবে, ততদিন শক্তি সঞ্চয় সম্ভব নয়। তাই পুরোনো নেতাদের ফেরানো, শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন এবং ঐক্যের ভিত্তিতে সংগঠন পুনর্গঠন—সব মিলিয়ে দলটি এখন এক কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে।
পতাকানিউজ/এনটি

