আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কঠোর প্রস্তুতি ও সর্বোচ্চ সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজনের লক্ষ্যে নানামুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে নিরাপত্তা, সমন্বয় ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সহিংসতা ও গুজব প্রতিরোধের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কমিশনের অবস্থান
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
তিনি জানান, কমিশনের একার পক্ষে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, তাই সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বয় অপরিহার্য। তিনি আরও নির্দেশনা দেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে পরিকল্পনা করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার” কাঠামোর আওতায় ৬২টি জেলায় সেনা মোতায়েন থাকবে। ভোটের আগের তিন দিন, ভোটের দিন এবং পরবর্তী চার দিনসহ মোট আট দিন মাঠে থাকবে বাহিনী। প্রায় এক লাখ সেনা সদস্য নির্বাচনী দায়িত্বে অংশ নেবেন। ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদারে ড্রোন, কমান্ডো টিম, হেলিকপ্টার ও আর্মি এভিয়েশন প্রস্তুত থাকবে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান, গাড়ি অধিযাচন ও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়
সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনা ও নৌবাহিনীর যৌথ মোতায়েন থাকবে। উপকূলীয় ১১টি আসনে নৌবাহিনীর নিজস্ব জলযানের পাশাপাশি বেসরকারি নৌযানও ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে। বিমানবাহিনী জানায়, সরঞ্জাম ও জনবল পরিবহনে পরিবহন বিমান প্রস্তুত থাকবে।
আনসার ও ভিডিপির ভূমিকা
আনসার ও ভিডিপি জানায়, এবারের নির্বাচনে এক লাখ ৫৫ হাজার প্রশিক্ষিত সদস্য মোতায়েন করা হবে। তারা আট দিনের জন্য দায়িত্বে থাকবেন। প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে দুটি অস্ত্রসহ টিম থাকবে, বিশেষ কেন্দ্রে তিনটি। দায়িত্বপ্রাপ্তদের কিউআর কোডযুক্ত পরিচয়পত্র দেওয়া হবে এবং সব ভাতা অনলাইন পদ্ধতিতে প্রদান করা হবে।
গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারি
ডিজিএফআই ও এনএসআই জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ের তথ্য দ্রুত কমিশন ও বাহিনীগুলোর কাছে সরবরাহ করা হবে। ভুয়া তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে কমিশন থেকে দ্রুত সঠিক তথ্য প্রচারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এনএসআই জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা তৈরি হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য নিয়মিত বৈঠক করা হবে।
র্যাব, সিআইডি ও পুলিশের পরিকল্পনা
র্যাবের ৫ হাজার ৫০০ সদস্য মোবাইল টিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সিআইডি জানায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো গুজব শনাক্তে বিশেষ সাইবার ইউনিট কাজ করছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনী প্রস্তুতি শেষ হবে এবং প্রতি ভোটকেন্দ্রে আচরণবিধি প্রতিপালনে সহায়তার জন্য বিশেষ টিম থাকবে।
বিজিবি ও কোস্টগার্ডের তৎপরতা
বিজিবি জানায়, সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪৯২টি উপজেলায় ১১ হাজার ৬০ প্লাটুন মোতায়েন করা হবে। কোস্টগার্ড ৯টি জেলার উপকূলীয় এলাকায় দায়িত্বে থাকবে এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বাজেটের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচন
এনটিএমসি জানিয়েছে, দুর্গাপূজায় ব্যবহৃত মনিটরিং অ্যাপের আদলে একটি নতুন অ্যাপ তৈরি করা হবে, যা ভোট পর্যবেক্ষণ, গুজব প্রতিরোধ ও তথ্য যাচাইয়ে ব্যবহৃত হবে। স্বরাষ্ট্র সচিবের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বডিওর্ন ক্যামেরা বসানো হতে পারে এবং আশপাশের দোকানগুলোকেও রেকর্ডিংয়ের আওতায় আনা হবে।
কমিশনের দিকনির্দেশনা ও চূড়ান্ত বার্তা
নির্বাচন কমিশনাররা বলেন, সমন্বয় ও স্বচ্ছতার মাধ্যমেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। প্রতিটি বাহিনীকে নিজ নিজ দায়িত্বে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গুজব দমন, অবৈধ অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তাঁরা।
কমিশনের সর্বশেষ নির্দেশনা—নির্বাচনের দিন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি রাখতে হবে, যাতে জনগণ মনে করে এটি সত্যিই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের উৎসব, কোনো শঙ্কার দিন নয়।
পতাকানিউজ/এনটি

