নির্বাচনের আগের দিন যখন ব্যাংক বন্ধ, আর্থিক লেনদেন সীমিত করতে নির্বাচন কমিশনের নানা ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর তখনই নীলফামারী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান বিমানে চড়েছিলেন নগদ ৭৪ লাখ টাকা নিয়ে। আটকের পর পুলিশেরি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে এই নেতা দাবি করেছেন, টাকাগুলো ব্যবসা এবং গার্মেন্টসের।
জামায়াত নেতা বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা নিয়ে বিমানবন্দরে আটকের খবর যখন সারাদেশে প্রলয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়, তখনই কুমিল্লায় টাকা বিতরনের সময় আটক হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আরেক নেতা। হাবিবুর রহমান হেলালী নামের এই নেতাকেও আটক করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে নগদ দুই লাখ টাকা।
নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ভোটের আগের দিন বুধবার বেলা ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, তাঁর কাছে ৭৪ লাখ টাকা ছিল। ঘটনাটি নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসহ সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিমানবন্দরে আটক জামায়াত নেতার বিষয়ে সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম বিকেলে জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ মোট ৭৪ লাখ টাকা। আটককৃত জামায়াত নেতাকে আইন অনুযায়ী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রথমে জামায়াত নেতা বলেছিলেন, তাঁর কাছে অর্ধ কোটি টাকার বেশি অর্থ রয়েছে। পরে সবার উপস্থিতিতে টাকাগুলো গোনা হলে ৭৪ লাখ টাকা পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সূত্রে জানা গেছে, বেলাল উদ্দিন ঢাকা থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে একটি ফ্লাইটে এসেছিলেন। তাঁর ব্যাগে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকা থাকার তথ্য ছিল। বিমানবন্দরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক আবদুল মান্নান, তবে তাঁকে আটক করা হয়নি।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় বেলাল উদ্দিন জানান, তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদরের হাজীপাড়ায় এবং তিনি শিক্ষকতা করেন। ব্যাগে থাকা অর্থ সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, ব্যাগে ৪০-৫০ লাখ টাকা আছে। এগুলো ব্যবসা ও গামের্ন্টের টাকা।’
জিজ্ঞাসাবাদের সময় অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে প্রথমে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) নাজমুল হুদা বলেন, তাঁর বুকে ব্যথা ছিল। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, উদ্ধারকৃত অর্থের উৎস ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য জানার জন্য বেলাল উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নির্বাচনী পরিবেশকে ঘিরে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বহন করা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে জেলা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
‘এতো টাকা ছিল না, খাবারের অল্প টাকা ছিল’
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় ভোটের আগের দিন ভোটারদের মাঝে টাকা বিতরণের অভিযোগে হাবিবুর রহমান হেলালীকে আটক করেন স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে থানায় নিয়ে যান। এই সময় তাঁর কাছ থেকে নগদ ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে স্থানীয় জামায়াত নেতারা এটিকে ‘ষড়যন্ত্র’বলে দাবি করেছেন।
আজ বুধবার সকালে উপজেলার ছালিয়াকান্দি ইউনিয়নের নেয়ামতকান্দি এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। দুপুরে হাবিবুর রহমান হেলালীকে আটক করে মুরাদনগর থানায় আনা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান হেলালী উপজেলার ধামঘর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির এবং ছালিয়াকান্দি ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক। স্থানীয়রা বলছেন, আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি ভোটারদের মাঝে টাকা বিতরণ করছিলেন। বিষয়টি টের পেয়ে তাঁকে আটক করে প্রশাসনকে খবর দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে, ১ হাজার টাকার দুটি বান্ডিলে থাকা ২ লাখ টাকা উদ্ধার করে হাবিবুর রহমান হেলালীকে থানায় নিয়ে যান।
আটকের পর হাবিবুর রহমান হেলালী অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর কাছে এত টাকা ছিল না। নির্বাচনী এজেন্টদের খাবারের জন্য অল্প কিছু নগদ ছিল। তাঁর গাড়িতে জোর করে অতিরিক্ত টাকা রেখে বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।
মুরাদনগর উপজেলা জামায়াতের আমির আ ন ম ইলিয়াসও একই দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘ওই ইউনিয়নে দায়িত্বশীল কেউ না থাকায় ধামঘর ইউনিয়নের হাবিবুর রহমান হেলালীকে ছালিয়াকান্দি ইউনিয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের নামে মূলত বিএনপির লোকজন তাঁকে আটক করেছে। তাঁর সঙ্গে টাকা ছিল না। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে একটি বাজারের ব্যাগে দুই লাখ টাকা তাঁর গাড়ির পেছনের মালামাল রাখার জায়গায় রেখে দিয়েছে।’
তবে স্থানীয় বিএনপি নেতারা এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেছেন। মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘জামায়াত কুমিল্লা-৩ আসনের প্রতিটি এলাকায় এভাবে টাকা বিতরণ করে ভোটের পরিবেশ নষ্ট করছে। আজ সকালে একটি এলাকায় টাকা বিতরণের সময় স্থানীয়রা একজনকে হাতেনাতে আটক করেছেন। জামায়াত ভোটের পরিবেশ নষ্ট করছে এবং নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।’
বেলা ৩টার দিকে মুরাদনগর উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান জানান, ‘টাকা বিতরণের খবর পেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পরে ওই ব্যক্তিকে আটক করে থানায় আনা হয়। যেহেতু তাকে টাকা বিতরণের সময় হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি, তাই বিষয়টি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে জানানো হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা তার অধীনে নেওয়া হবে।’
কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে ভোটে লড়ছেন ৯ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, যিনি আসনটির পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য। এছাড়া ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ইউসুফ সোহেলও লড়ছেন।
-পতাকানিউজ

