নারায়ণগঞ্জের ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট (সিজেএমসি) ভবনটি ছয় বছর ধরে অচল পড়ে আছে। আদালতের বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনজীবীদের ব্যবহার শুরু না হওয়ায় অবহেলা-অযত্নে ভবনটি এখন পরিণত হয়েছে এক ‘ভুতুড়ে বাড়িতে’।
২০১৯ সালে আটতলা এই আধুনিক ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও আজও সেখানে কোনো বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে ভবনের বৈদ্যুতিক ও স্যানিটারি ফিটিংস, লিফটসহ মূল্যবান মালামাল ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা।
নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক গণপূর্ত দপ্তর থেকে দীর্ঘদিন ধরে এ ভবনটি হস্তান্তর ও ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাদেশের ৬৪ জেলা সদরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’–এর প্রধান সমন্বয়ককে পাঠানো স্মারক নং ১৮১৫/১(১১) অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কর্তৃক পত্র পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ‘ভবনের বৈদ্যুতিক, স্যানিটারি ফিটিংস ও লিফটসহ বহু মূল্যবান উপকরণ অকেজো হয়ে পড়ছে। অবস্থা এমন যে ভবনটি যত দিন অচল থাকবে, তত দ্রুতই তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
নারায়ণগঞ্জে জেলা জজ ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সংখ্যা এখন ৬৭, সঙ্গে রয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রায় দুই হাজারের বেশি প্র্যাকটিসিং আইনজীবী প্রতিদিন আদালতের কাজে অংশ নেন। কিন্তু আলাদা ভবন না থাকায় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ ১১ জন বিচারক এবং ৭৫ জন স্টাফ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলার ছোট কক্ষগুলোতে অস্থায়ীভাবে বিচারিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই বসেন নিচতলার এক সংকীর্ণ কক্ষে, যেখানে এজলাস পর্যন্ত পৌঁছাতে হয় সরু বারান্দা পেরিয়ে। বারান্দার কোণে কম্পিউটার টেবিলে কাজ করেন কয়েকজন সহকারী ও নিরাপত্তা প্রহরী। এমনকি বিচারকের নিজেরও নেই সরকারি বাসভবন।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা জজ ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মিলিতভাবে প্রায় ৫০ হাজার মামলা বিচারাধীন অবস্থায় আটকে আছে। ভবন সংকটের কারণে বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, আর মামলার জটও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

একজন আদালত কর্মকর্তার ভাষায়, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ন্যায়বিচার পেতে আরও বিলম্ব হবে। অবিলম্বে নতুন ভবন চালু না করলে বিচারব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটবে।
গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, নবনির্মিত জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনটি আমাদের জন্য মস্ত বড় পেইনে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে, কিন্তু ব্যবহার শুরু করা যাচ্ছে না।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমরা চাই জেলা জজ কোর্ট ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট একই জায়গায় স্থাপন করা হোক। এতে বিচারপ্রার্থীরা সুবিধা পাবেন।’

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ. এফ. এম. মুশিউর রহমান প্রস্তাব দিয়েছেন, যদি ভবনটি বিচারিক কাজে ব্যবহার না করা হয়, তবে এটি যেন পরিত্যক্ত না রেখে অন্য কোনো সরকারি কাজে ব্যবহার করা হয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আইনজীবীদের দাবিটি আমরা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছি। বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছি।
চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, বিষয়টি যথাযথভাবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আশা করি দ্রুত সমাধান হবে।

২০০২ সালে পুরোনো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা জজ আদালত ভবন ও জেলা কারাগার শহরের বাইরে স্থানান্তর করা হয়। সেই জায়গায় ৩.৩০৫ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ডাকঘর, শিল্পকলা একাডেমি ও সিজেএমসি ভবন। এর মধ্যে ৮১.৫৬১ শতাংশ জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এই আটতলা ভবন, আর পাশের ৭২.৮০১ শতাংশ জায়গায় র্যাব–১১-এর অস্থায়ী কার্যালয়।
কিন্তু নতুন এই সিজেএমসি ভবনের ভেতর এখন অন্ধকার, ফাঁকা করিডর আর ধুলো-জমা কক্ষগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে। আদালত সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন- ৩১ কোটি টাকার এই ভবনটি নির্মাণের ছয় বছর পরও কেন ব্যবহার শুরু হচ্ছে না?
একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর আদালত ভবন ব্যবহার না হওয়ায় বিচারব্যবস্থা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সরকারি সম্পদও। এখন প্রশ্ন উঠেছে- অবহেলায় পড়ে থাকা এই ভবনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে কে?
পতাকানিউজ/এনটি

