বাংলাদেশের শহর, বন্দর, হাট-বাজার, বাস টার্মিনাল কিংবা রেলস্টেশন—যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, পথশিশুদের দেখা পাওয়া যায়। অনেকে তাদের দেখে মায়ায় আবদ্ধ হয়ে খাবার দেন বা সামান্য অর্থ সহায়তা করেন। কিন্তু এ সহায়তা ক্ষণিকের, তাদের জীবনের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। প্রশ্ন জাগে—এই শিশুদের যদি সঠিকভাবে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও উন্নয়নের পথে তারা একসময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না তো?
পথশিশু কারা বা তাদের জীবন যাত্রা কেমন তা প্রায় সবারই জানা। কারণ চলতি পথে সবার সামনে রাস্তা ঘাটে, হাটে বাজারে, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনে তাদের দেখা মেলে। তাদের কে কাছে পেলে আমাদের অনেকেরই হৃদয়ে মায়া সৃষ্টি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সাময়িক সময়ের জন্য খাদ্য বা অর্থ দিয়ে সহযোগিতাও করে থাকি। কিন্তু এ সহযোগিতা তাদের মুখে সাময়িক হাসি ফুটাতে পারলেও তাদের জীবন মানে বা সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। আমরা একবারও ভাবি কিনা এ পথশিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারলে আমার, আপনার এবং পরিশেষে দেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে তারা একটি বড় বাধা।
এখন আসা যাক পথশিশুরা কীভাবে তারা এ অবস্থায় উপনীত হয়। সহজ কথায় পিতা মাতার স্নেহ ভালোবাসা ও সুবিধা বঞ্চিত শিশু যারা অভিভাবকহীন অবস্থায় রাস্তা ঘাটে, হাটে বাজারে, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনে চলাফেরা করে এবং মানুষের দেয়া দান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোটো খাটো কাজের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে জীবন ধারণ করে। সাধারনত বাবা মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ, বাবা বা মায়ের অথবা উভয়ের অবর্তমানে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে একটি নিষ্পাপ শিশুর পরিণতির নাম এ ‘পথশিশু’।
আর এ পথশিশুদের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে হয়ে ওঠে অপরাধজগতের অন্যতম সদস্য। বলা যেতে পারে, পুলিশ ঠিকমত কাজ করলে এ পথশিশুরা কখনই অপরাধ করতে পারত না। এ কথা সত্য যে, অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনার অন্যতম দায়িত্ব হল পুলিশের। মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায়, কোনো অপরাধে জড়িত পথশিশুকে আটক করে কোর্টে প্রেরণ করলে কোর্ট থেকে তাদেরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (পূর্বে যা ছিল শিশু সংশোধনাগার) প্রেরণ করা হয়। তবে গুরুতর কোন অপরাধের সাথে জড়িত না হলে শিশুর অভিভাবক তার জিম্মায় নিয়ে আসে। অতঃপর সে শিশুই আবার একই কাজে লিপ্ত হয়।
অপরাধীরা ইদানিং অস্ত্র, মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ জিনিস নিরাপদ বহনে শিশুদের ব্যবহার করে থাকে। মাদক পরিবহন ও বিশেষ করে খুচরা পর্যায়ে মাদক বিক্রিতে শিশুদের বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কারণ শিশুরা বিভিন্ন টহল বা চেকপোস্টে তল্লাশির আওতায় কম আসে। আর এ সুযোগটি অপরাধীরা কাজে লাগায়। অপরাধী চক্রই অনেক ক্ষেত্রেই শিশুকে আইনী সহযোগিতা প্রদান করে তাকে আবারও তার অবৈধ কাজে নিয়োজিত করার জন্য। ফলে এ পথ শিশুরা এ অপরাধ জগত থেকে আর আলোর মুখ দেখতে পারে না।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বিস্তৃত এবং শক্তিশালী হলেও পথশিশুদের উন্নয়নে সামগ্রিকভাবে টেকসই একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি অর্থাৎ সমাজের সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সরকারের বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ব্যক্তি এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে দেশে অনেক এতিম খানা রয়েছে সেখানে মুসলিম পরিবারের অতিদরিদ্র শিশুদের বিনা খরচে এবং স্বল্প খরচে থাকা, খাওয়া সহ ইসলামী শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে দেশের অতিদরিদ্র এবং দরিদ্র শিশুদের জন্য একটি মহতী উদ্যোগ এবং তাদের তিন বেলা খেয়ে পরে বেঁচে থাকার একটি বড় অবলম্বন। এ ব্যবস্থা না থাকলে এ ব্যবস্থাপনার অধীনে থাকা হাজার হাজার শিশুরই ঠিকানা হতো এ রাজপথ, আর তাদের নাম হতো ‘পথশিশু’।
খ্রিস্টান ধর্মে মিশনারী এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আশ্রম এর মাধ্যমে খুবই স্বল্প পরিসরে দরিদ্র শিশুদের লেখাপড়াসহ বেঁচে থাকার জন্য ব্যবস্থা আছে। সরকারিভাবে জেলা ও কিছু ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে সর্বমোট ৮৫টি শিশু পরিবার রয়েছে যেখানে এতিম শিশুদের থাকা, খাওয়া ও লেখাপড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তার মধ্যে ৪২টি বালক, ৪২টি বালিকা ও একটি মিশ্র (অর্থাৎ একই প্রতিষ্ঠানে পৃথকভাবে বালক ও বালিকাদের জন্য ব্যবস্থা) শিশু পরিবার রয়েছে। এ শিশু পরিবারগুলোতে ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী এতিম অর্থাৎ পিতৃহীন বা পিতৃমাতৃহীন দরিদ্র শিশুদের অভিভাবকদের আবেদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে যাচাই বাছাই সাপেক্ষে ভর্তি করা হয় এবং ১৮ বছর পর্যন্ত পারিবারিক পরিবেশে স্নেহ-ভালোবাসা ও আদর যত্নে লালন পালনসহ লেখাপড়া ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
এ শিশু পরিবারগুলোর বিদ্যমান সমস্যা অথবা অধিকতর উন্নয়ন বা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়ে এ পর্যায়ে কোনো আলোচনা না করে এ শিশু পরিবার ব্যবস্থার বাইরে থাকা একই বাস্তবতার দরিদ্র এতিম শিশুদের বিষয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হল। সরকারের বিদ্যমান শিশু পরিবার এর ধারণা এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা খুবই আদর্শিক এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র সৃষ্টির অন্যতম প্রাথমিক উদ্যোগ। কিন্তু যে এতিম শিশুর বয়স ৬ বছরের কম এবং ৯ বছরের বেশি তাদের জন্য এ রাষ্ট্র ব্যবস্থার কী কোন করনীয় নেই? তারা কেন এ শিশু পরিবারের মত মহতী ব্যবস্থাপনার আশির্বাদ হতে বঞ্চিত হবে?
হ্যাঁ, সরকারের এ শিশু পরিবার ব্যবস্থাপনার শুরুর দিকে হয়ত এর থেকে বেশি কিছু পরিকল্পনা বা বাস্তবায়ন করার সরকারি সামর্থ ছিল না, যা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সব এতিম শিশুদের নিয়ে পরিকল্পনা এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব নয়। আর এটা করতে পারলে পথশিশুদের আর পথে পথে থাকতে হবে না। দেশের আইনশৃঙ্খলা অবনতিতে পথশিশুরা আর যুক্ত হবে না বরং তারা জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে এবং দেশের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার হবে।
এখন কীভাবে বিপুল সংখ্যক এতিম বা পথশিশুদের এ সরকারি শিশু পরিবার বা একই ধরনের সুবিধা প্রদানের জন্য অন্য কোনো একটি ব্যবস্থাপনার অধীনে আনা যায়। প্রশ্ন আসতে পারে এ খাতে সরকারের এত অর্থ ব্যয় করার সামর্থ আছে কি না? হ্যাঁ, একসাথে এত বড় কাজে সরকারের অবশ্যই সীমাবদ্ধতা আছে। তবে সবকিছু শুধুমাত্র সরকার করবে কেন? আর সরকার করলেও তা একদিনে বা এক বছরের মধ্যেই করে ফেলতে হবে তা তো নয়। একটি বড় পরিকল্পনা নিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে গেলে নিশ্চই একদিন তা পূর্ণাঙ্গতা পাবে।
বিশ্বের মধ্যে বাঙ্গালী জাতির একটি বড় সাফল্য রয়েছে আর তা হল ভূমিহীনদের ভূমির মালিকানা সহ ঘর তৈরি করে দেয়া। কিন্তু বড় পরিকল্পনা না করলে বা পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ শুরু না করলে এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলে কোনো বড় সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয় না।
বিদ্যমান ব্যবস্থার সরকারি শিশু পরিবার পরিচালনার ব্যবস্থাপনাকে আরও যুগোপযোগী করা সহ ৬ হতে ৯ বছর বয়সের বাইরে থাকা একই পরিণতির সকল শিশুকে এ সুবিধার আওতায় আনতে হবে। তবে বর্তমানে যে সব শিশুদের অপরাধী চক্রগুলো ভিক্ষা বৃত্তি, মাদক পরিবহনসহ বিক্রি, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে নিয়োজিত করে সেসব শিশুদের বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে এনে শিশুপরিবার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে হবে।
কিছু বেসরকারি সংস্থা যারা ছিন্নমূল শিশুদের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে তারা এ ছিন্নমূল শিশুদের লেখাপড়াসহ নিরাপদ জীবন যাপনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করলেও শিশুদের ব্যবহারকারী অপরাধীদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তারা ব্যর্থ হন। কারণ, অপরাধীরা শিশুদের অপরাধ জগত থেকে আলোর পথে যেতে দিলে তাদের এ অবৈধ ব্যবসা আর চলবে না। ফলে এ পথশিশুরা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনজরে আসলেও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয় না। এ জন্য আইন করে এ ধরনের শিশুদের সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
হালবিহীন একটি নৌকার হাল ধরে সেটাকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারলে সে নৌকা হাল ধরা লোকটাকেও এক সময় নদী পার হতে সাহায্য করতে পারবে। রাষ্ট্র আজ এ ছিন্নমূল শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের পেছনে অর্থ ব্যয় করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে তারাই হবে একদিন এ রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। এ পথশিশুদের সকলকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে বাকিদের কর্মমূখী শিক্ষা প্রদান করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে দেশে এবং বিদেশের শ্রম বাজারে নিযুক্ত করতে পারলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে এবং প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা দেশে আনা সম্ভব হবে।
সরকার শিশুপরিবার ব্যবস্থাপনায় সব পথশিশু বা ছিন্নমূল শিশুকে অন্তর্ভূক্ত করে এ সংক্রান্ত সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারিভাবে সমন্বয় সাধন নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এক্ষেত্রে সফলতা আসতে সরকারের তেমন কোন বিলাসী বাজেটের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
পতাকানিউজ/কেএস

