রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটের সামনে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাসডুবির ঘটনায় তৃতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে ডুবুরি দল। আজ শুক্রবার সকাল আটটার পর থেকে ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ডুবুরি দল আবারও নদীতে নেমে তল্লাশি কার্যক্রম শুরু করে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে দিনের উদ্ধার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান মো. সোহেল রানা জানান, আজকের অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের ৬ জন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৬ জন সদস্য অংশ নিচ্ছেন। মোট ১২ সদস্যের এই ডুবুরি দল দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে।
এখন পর্যন্ত ২৬ মরদেহ উদ্ধার
এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ২৫ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একজনের মরদেহ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। নিহত ওই ব্যক্তির স্বজনেরা দিনাজপুর থেকে রাজবাড়ীতে পৌঁছালে তাদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
এদিকে নিহতদের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তাও দেওয়া শুরু হয়েছে। রাজবাড়ী জেলার ১৮ জন নিহতের মধ্যে ১৭ জনের পরিবারের কাছে ইতোমধ্যে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কালুখালী উপজেলার একটি পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে মানিকগঞ্জে অবস্থান করায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরে সহায়তার চেক হস্তান্তর করা হবে।
নতুন নিখোঁজের তথ্য নেই, তবুও অনুসন্ধান চলছে
জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত নতুন করে কেউ নিখোঁজের তথ্য নিয়ে যোগাযোগ করেননি।
তবে ফায়ার সার্ভিসের কাছে একজন নিখোঁজ থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
নিখোঁজ হিসেবে যাঁর নাম এসেছে তিনি হলেন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের শ্যামসুন্দরপুর গ্রামের বাসিন্দা রিপন শেখ (৪০)। তিনি পেশায় একজন ভাটাশ্রমিক এবং মৃত আবদুল বারেক শেখের ছেলে।
ভাইয়ের খোঁজে বোনের আকুতি
নিখোঁজ রিপন শেখের ছোট বোন মুক্তা আক্তার (সোহানা শোভা) জানান, দুর্ঘটনার দিন বুধবার দুপুরে রিপন তাঁর ছোট ভাই সুমন শেখের সঙ্গে বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন।
সুমন শেখ ঢাকার ইসলামপুর এলাকায় একটি কারখানায় কাজ করেন।
মুক্তা আক্তার জানান, বিকেলের দিকে রাজবাড়ী শহরের নতুন বাজার মুরগির ফার্ম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রিপনকে রেখে সুমন পাশের একটি দোকানে চা পান করতে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে তিনি বড় ভাইকে আর সেখানে দেখতে পাননি।
পরে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে সুমন নিজেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ঢাকায় পৌঁছে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিজের নিরাপদে পৌঁছানোর খবর দেন। তবে বড় ভাই রিপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, কারণ তাঁর কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না।
মুক্তা আক্তার বলেন, ‘বড় ভাই বাড়িতে মুঠোফোন রেখে গিয়েছিল। ঢাকায় পৌঁছে নতুন ফোন কিনে আমাদের জানানোর কথা ছিল। কিন্তু সে আদৌ ঢাকায় পৌঁছেছে কি না, সেটাই আমরা জানতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বুধবার রাতে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় বাসডুবির খবর শোনার পর থেকে আমরা খুব দুশ্চিন্তায় আছি। বুঝতে পারছি না বড় ভাই ওই বাসে ছিল কি না, নাকি অন্য কোথাও গেছে।’ তিনি জানান, রিপনের স্ত্রী বর্তমানে বাবার বাড়ি রাজশাহীতে অবস্থান করছেন। নিশ্চিত তথ্য না থাকায় এখনো তাকে বিষয়টি জানানো হয়নি।
মুক্তা আক্তার বলেন, ‘যদি সে ঢাকায় থাকত তাহলে অবশ্যই আমাদের খবর দিত। আমরা ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় বিষয়টি জানিয়েছি। এখন শুধু অপেক্ষা করছি কোনো খবর পাওয়ার জন্য।’
উদ্ধারকারীদের বক্তব্য
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে মুক্তা আক্তার তার ভাই নিখোঁজ থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি রিপন শেখ ওই দুর্ঘটনাকবলিত সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসের যাত্রী ছিলেন কি না।
তিনি বলেন, ‘নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। তবে তিনি যে ওই বাসের যাত্রী ছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারপরও উদ্ধার অভিযান চলাকালে নতুন কোনো মরদেহ পাওয়া গেলে নিখোঁজদের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।’
তিনি আরও জানান, নদীর স্রোত, পানির গভীরতা এবং দুর্ঘটনাস্থলের পরিবেশগত জটিলতার কারণে উদ্ধার অভিযান চালাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও সম্ভাব্য সব জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, নিখোঁজ থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং প্রয়োজন মনে হলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর থেকে ফেরিঘাট এলাকায় স্বজনদের আহাজারি এবং উৎকণ্ঠা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অনেকেই এখনো শেষবারের মতো নিশ্চিত হতে চান তাদের স্বজনরা ওই বাসে ছিলেন কি না।
উদ্ধার অভিযান ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
-পতাকানিউজ

