পরবর্তী টার্গেট কে? আপনি নাকি আপনার সন্তান? -এইটুকু পড়েই কি গা শিউরে উঠছে?
কেন এমন গা শিউরে উঠা দশা? কাদের কারণে? একবার ভাবুন তো- আমি কিংবা আপনি কী করছি। কাদের সঙ্গে সমাজে বসত করছি। সমাজে আমাদের আশপাশে কারা ত্রাস সৃষ্টি করছে? দেখছেন- একদল কিশোর? এরা কারা? কাদের সৃষ্টি?
সদ্য কৈশোরে উত্তীর্ণ কোন ছেলে গ্যাং সদস্য হিসেবে জন্মগ্রহণ করেনি। সমাজের অভিভাবকরা নিজেদের প্রয়োজনে তাদের ‘গ্যাং সদস্য’ কিংবা ক্ষেত্রে বিশেষে ‘গ্যাংস্টার’ বানায়।
এসব কিশোরদের হাতে প্রথমে হাত খরচের নামে কিছু টাকা দেয়। তারপর ছোটখাটো বিপদে পাশে থাকা, সুযোগ বুঝে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করা, এরপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া। এবার প্রশিক্ষিত কিশোরের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই সৃষ্টি করে ‘কিশোর গ্যাং’।
এর পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে রাজনীতির চৌকষ খেলোয়াড়। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদেরই প্রত্যক্ষ মদদে ১২-১৮ বছর বয়সী কিশোরদের সংগঠিত করে। বিপথগামী কিশোরদের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করে চুরি, ছিতাই, মাদক পাচার কিংবা চাঁদাবাজি।
মানে, যতো অপকর্ম আছে-সবই করানো হয় কিশোরগ্যাং সদস্যদের দিয়ে। নেপথ্যেই থাকেন মুখোশধারী রাজনৈতিক নেতা। সমাজে তিনি উঁচু আসনে বসে রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন। তিনিই আবার কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করান কিশোরগ্যাং সদস্যদের।
এই কিশোরগ্যাং সদস্যদের নিয়ে কথা বলার মুল উদ্দেশ্যে হৃদয়ভাঙা আর্তনাদ। আমার খালাতো ভাই মোহাম্মদ শাহাদাত মাত্র ৩৩ বছর বয়সে দুনিয়ার সফর শেষ করেছে। চারজন শিশু সন্তান রেখে এতো অল্প বয়সে দুনিয়ার সফর শেষ করা সত্যিই মর্মান্তিক। আমাদের পরিবারের জন্য বড়ই শোকগাঁথা।
মোহাম্মদ শাহাদাতের অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য আমরা প্রত্যেকেই দায়ী। আমাদের সমাজ, সমাজব্যবস্থা, ক্ষমতালোভী নেতা, বিচার ব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্র –সম্মিলিতভাবে দায়ী।
শাহাদাতের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত? কারা অর্থের জোগানদাতা? পেছনে কারা কলকাটি নেড়েছে -তা সমাজের কিংবা সাতকানিয়ার সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন বা জানার কথা।
সচেতনরা অবগত এই বিপথে যাওয়া কিশোরদের কারা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু কেউ-ই প্রকাশ করেন না। বা করতে পারেন না। কারণ প্রত্যেকেই শঙ্কিত নিজ ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে।
২০২৫ সালের ৫ আগষ্টের পর অনেক নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে কিশোর অপরাধ নিয়ে। রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনে পেশী শক্তি লাগে। কেন্দ্র দখল, ভোটারের মনে ভয়ভীতি সৃষ্টি কিংবা ব্যালট ছিনতাই এ কিশোর গ্যাং এর বিকল্প নেই।

আমি শিক্ষক মানুষ। এসব কিশোর গ্যাং কিংবা তাদের অপরাধের ধরণ, মাত্রা কিংবা তাদের লালন নিয়ে আমার জ্ঞানের পরিধি সীমিত। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে যখন ভাবি-কিশোরগুলোর অপরাধ আমার কাছে অনেকাংশেই তুচ্ছ হয়ে যায়, যখন রাজনৈতিক নেতারা কিশোরগ্যাং লালন করছে-এটা দেখি। অথচ, শিক্ষক হিসেবে আমার নিজেরই দায়িত্ব, কিশোরদের সুশিক্ষা দেওয়া। কিন্তু সেটা এই সমাজ ব্যবস্থায় বৃহত্তর পরিসরে খুব বেশি কি হচ্ছে?
ব্যক্তিগতভাবে আমি আশায় ছিলাম, জাতীয় নির্বাচনের পর সাতকানিয়ায় কিশোর-গ্যাং দমন করা হবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর কিশোর গ্যাং দমন তো দূরের কথা। উল্টো কিশোর-গ্যাং পুরো সমাজ ব্যবস্থায় ‘ক্যান্সারে’ পরিণত হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে পেশীশক্তির ব্যবহারের জন্য কিশোর গ্যাংয়ের নতুন নতুন অভিভাবক সৃষ্টি হয়েছে। নতুন বড় ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে তারা ভয়ানক ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ত্রাসের সামনেই মোক্ষম সুযোগ হয়ে আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তখন হয়তো নেতারা স্থানীয় নির্বাচনের জন্যই কিশোর-গ্যাং সদস্যদের মদদ দিয়ে পরিপুষ্ট করে তোলবেন।
এই সময়টাতে হয়তো আরো একাধিক মায়ের বুক খালি হবে। কিংবা অনেক সন্তান তাদের বাবাকে হারাবে। মোহাম্মদ শাহাদাতের শিশু সন্তানের মতো কিংবা শাহাদাতের সদ্য বিধবাদের আর্তনাদ বৃদ্ধি পাবে।
এটাও জানি, আগামী কয়েকদিনে মোহাম্মদ শাহাদাতের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কিছু কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হবে। তারপর কারাগার থেকে ওই নেতাদের ইশারায় কিশোর-গ্যাং সদস্যরা জামিনে বেরিয়ে আসবে। তারপর আবার টর্ণেডো গতিতে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক হবে এই জামিনপ্রাপ্ত আসামিরাই। তাদের সেই ভয়ংকর রূপ দেখতে কেমন হবে- তা ভেবে আমি এখন থেকেই শঙ্কিত।
এই কিশোরগ্যাং সমস্যা থেকে উত্তোরণের উপায় কী? কারা ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন? –সেটা বলা মুশকিল। কারণ, যাদের ক্ষমতা দরকার, ক্ষমতাকে পোক্ত করতে পেশিশক্তি দরকার- তারাই কৌশলে কিশোরগ্যাং জন্ম দেন, নিয়ন্ত্রণ করেন।
একইভাবে আমরা যারা নিজদের ভদ্রসমাজের বাসিন্দা দাবি করি, ভদ্র সেজে থাকতে পছন্দ করি, যারা কিশোরগ্যাং কিংবা সন্ত্রাসকে অপছন্দ করি – তারাই আবার ওই নেতাদের নির্বাচিত করি। সমাজ ও দেশ শাসনের নেতা বানাই।
এর মানে কী দাঁড়াল? – ভদ্রসমাজ দেশ পরিচালনার জন্য নেতা নির্বাচন করেন। আবার সেই নেতাই কৌশলে কিংবা আড়ালে-আবড়ালে নিজের ক্ষমতাকে পোক্ত করতে কিশোরগ্যাং কিংবা সন্ত্রাসীদের লালন করেন।
-অর্থ্যাৎ, রাজনৈতিক নেতার নিয়ন্ত্রণেই থাকছে কিশোরগ্যাং। একই নেতার হাতে থাকছে আইন তৈরির ক্ষমতা। অতএব, আমজনতার নিস্তার কই?
তারপরও আমি আশাবাদী মানুষ।আশার আলো দেখতে চাই। শিক্ষক হিসেবে বলবো, কিশোর গ্যাং সদস্য, তাদের আশ্রয়দাতা, অর্থের জোগানদাতা এবং লালনকর্তা সবাইকে সমুলে উচ্ছেদ করতে পারলেই সমাজ কিশোরগ্যাং মুক্ত হবে।
এই মুক্ত সমাজ বিনির্মান করতে না পারলে সাতকানিয়ার প্রতিটি মানুষকে অপেক্ষা করতে হবে নতুন কোন অপমৃত্যুর জন্য। একবার ভাবুন, পরের হিটলিষ্টে কার নাম উঠবে? আপনি কিংবা আপনার সন্তান? –কে হবেন পরবর্তী টার্গেট? এবার কি গা শিউরে উঠে?
-এই টার্গেট যদি হতে না চান, তাহলে এখনই সম্মিলিত আওয়াজ তোলা উচিত, ‘কিশোরগ্যাং মুক্ত সাতকানিয়া চাই।’
লেখক : প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত), বাকলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম।
-পতাকানিউজ/এটি

