পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসুতি, গুণীজনরা বলতেন এ কথা। সেই পরিশ্রমই বদলে দিলো বগুড়ার এক নিভৃত পল্লীর সাহসী যুবক শহিদুলের ভাগ্য। সরকারি চাকরি ছেড়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার যুবক শহিদুল ইসলাম। ১০০ কোয়েল পাখি দিয়ে শুরু করেছিলেন। এখন তার খামারে ৭০ হাজার পাখি। বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকার কোয়েল পাখি, বাচ্চা আর ডিম বিক্রি করেন এ উদ্যোক্তা।
গাবতলীর দুর্গাহাটা গ্রামে বাড়ি শহিদের। কৃষক দিরাজ প্রামাণিকের দুই সন্তানের মধ্যে ছোট শহিদ ২০০৫ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরির পাশাপাশি এইচএসসি পাস করেন তিনি। এইচএসসির পর মাসখানেক পোশাক কারখানায় চাকরি করেছিলেন। সেটি ছেড়ে আবার ফেরেন সেই খণ্ডকালীন চাকরিতে।
২০১০ সালের দিকে শহরের ৭মাথায় কোয়েল পাখির ডিম খাওয়া দেখে খামার গড়ার চিন্তা করেন। সে সময় মাত্র সাড়ে ৩ হাজার টাকায় ১০০ কোয়েল পাখি দিয়ে শুরু করেন খামার। শুরুতে পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে তাকে তাচ্ছিল্য করত। এরই মধ্যে ২০১৬ সালে তিনি ত্রাণ ও দুর্যোগ অধিদপ্তরের কার্য সহকারীর চাকরি পান।
সরকারি চাকরির চেয়ে খামার বেশি লাভজনক হবে ভেবে ৩ বছর পর চাকরি ছেড়ে দেন। ফিরে আসেন খামারে। ইতিহাস বিভাগ থেকে এমএ পাস করা এই উদ্যোক্তার খামারের পাখি দিনে দিনে বেড়েছে। ১৪ বছরে তিনি ২ বিঘা জমি কিনে গড়ে তুলেছেন ছোট বড় ৩০টি কোয়েল পাখির খামার। যেখানে এখন পাখির সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশি। পাশাপাশি বাড়ি করেছেন খামারের আয় থেকেই।
উদ্যোক্তা শহিদুল ইসলাম জানান, জাপানি জাতের কোয়েল পাখি থেকে তিনি ডিম উৎপাদন করেন। ২ টাকা থেকে ৩ টাকা করে মাসে ৬ লাখ পিস ডিম বিক্রি, নিজস্ব ইনকিউবেটরে প্রতি মাসে দেড় লাখ বাচ্চা উৎপাদন, খাবার উপযোগী পাখি বিক্রি করেন প্রতি মাসে ৪৫ হাজার পিস।
২৫ থেকে ৩০ দিনে ২৪ টাকার খাবার খেয়ে একটি পাখি ২২০ থেকে ২৫০ গ্রাম ওজনের হয়। খাবার উপযোগী এসব পাখি ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়। ৪৫ থেকে ৬০ দিনের একটি পাখি বছরে তিন শতাধিক ডিম দেয়। ইনকিউবেটরে ১৮ দিনে বাচ্চা ফুটিয়ে তা ৭ টাকা পিস বিক্রি করেন তিনি। সব মিলিয়ে বছরে ৪ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়।

খামারের পরিচিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বর্তমানে ফেসবুকে ‘মা কোয়েল খামার’ পেজের মাধ্যমে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডিম ও পাখি সরবরাহ করছেন।
শহিদুল জানান, রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ সারাদেশেই যাচ্ছে তার কোয়েল পাখি। ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা ছাড়া অন্য কোনো রোগবালাই নেই কোয়েল পাখির, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি।
এক সময় কিছুই ছিল না শহিদের। এখন ২ বিঘার ওপর খামার গড়েছেন, বাড়ি বানিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন মা কোয়েল অ্যান্ড হ্যাচারি। গ্রামের বেকারদের স্বনির্ভর করতে উদ্যোগ নিয়েছেন, খামার গড়েছেন প্রায় ৩০টি। সেখানে চুক্তিভিত্তিক খামার দেখাশুনা করে অনেকেই লাভবান হচ্ছেন।
চাকরির পেছনে না ঘুরে বেকার যুবকদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গাবতলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম জানান, শহিদুল ইসলাম একজন সফল উদ্যোক্তা। তার গড়ে তোলা ‘মা কোয়েল অ্যান্ড হ্যাচারিতে এখন কমপক্ষে ৪০ জন বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে আরও অনেকেই চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। অনেকে আবার এখান থেকে কাজ শিখে নিজেই খামার গড়ে তুলেছেন। এটি খুব ভাল উদ্যোগ।’
পতাকানিউজ/পিএম/এসজিএন

