সবুজ চা-বাগান, পাহাড়, ঝরনা, হাওর আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি— প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্য খুব কম জেলাতেই একসঙ্গে মেলে। অথচ পর্যটনের এমন বিপুল সম্ভাবনা নিয়েও মৌলভীবাজার জেলা যেন এখনো অবহেলিত। ২০০৮ সালে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৮ বছর। এ সময়ে বেসরকারি উদ্যোগে রিসোর্ট-হোটেল গড়ে উঠলেও সরকারি অবকাঠামো, যোগাযোগ ও পর্যটকসেবায় কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। ফলে সম্ভাবনার দুয়ার খোলা থাকলেও পর্যটন শিল্পের বিকাশ আটকে আছে নানা সংকটে।
জানা যায়, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন জেলা মৌলভীবাজার। এ জেলার সাত উপজেলায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক মিলিয়ে প্রায় শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ৯২টি চা-বাগান, বিভিন্ন রিসোর্ট, পাহাড়, হাওর, জলপ্রপাত এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। চা জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতিও পর্যটকদের সহজেই আকৃষ্ট করে। গত এক দশকে বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন খাতে কিছুটা বিস্তার ঘটলেও সরকারি উদ্যোগে তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
২০০৮ সালে সরকার মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণা করে। দীর্ঘ এ সময়ে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জেলার কয়েকটি পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উন্নয়নকাজ হলেও অধিকাংশ স্থান এখনো পর্যাপ্ত সরকারি নজরদারি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে রয়েছে।
স্থানীয় পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটন জেলা ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ খাতের বিকাশে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। বেসরকারিভাবে আধুনিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠলেও মৌসুম ছাড়া বছরের অন্য সময় পর্যটক কম আসায় অনেক ব্যবসায়ী হতাশায় ভুগছেন। পর্যটককে সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে এখানকার পর্যটনকেন্দ্রগুলো নতুন করে সাজানো, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, বিমানে যাতায়াতের ব্যবস্থা, ট্রেনের টিকিট বৃদ্ধি, পর্যটকদের সুরক্ষা, উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে দেশ ও দেশের বাইরে এখানের দর্শনীয় স্থান নিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে; তবেই কিছুটা হলেও সংকট দূর হবে। একইসঙ্গে পর্যটক শিল্প বিকশিত হবে। তবে জেলার পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয় না।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেল কয়েক বছর ধরে মৌলভীবাজার জেলায় পর্যটন শিল্পের কথা চিন্তা করে বেসরকারিভাবে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠলেও পর্যটন শিল্পের সামগ্রিক তেমন বিকাশ হয়নি। কারণ সরকারিভাবে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নেওয়া হয়নি নান্দনিক কোন উদ্যোগ। পর্যটন কর্পোরেশনের কোনো মোটলও স্থাপিত হয়নি এ জেলায়। রিসোর্ট, হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে ব্যাক্তি উদ্যোগে অনেকই এগিয়ে এসেছেন।
তবে সরকারিভাবে ছোট পরিসরে কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রে কিছু কাজ করলেও বড় পরিসরে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রে জেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার একেবারে উন্নয়ন হয়নি। যাতায়াতের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন বাহন নেই। এ জেলায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ হলে চাকরি ও কর্মসংস্থান কয়েকগুণ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার পর্যটন শিল্পের উপর জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। এতে করে পর্যটন ব্যবসায় স্বল্প পরিসরে হলে অর্থনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে। সরকারিভাবে পর্যটন শিল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করলে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতো।

দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরতে আসা জারা রহমান, আবিদ হাসান, সাকিব চৌধুরী বলেন, এখানকার পরিবেশ-আবহাওয়া চমৎকার। একবার কেউ এলে বারবার আসতে চাইবেন। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে নানান সমস্যায় জর্জরিত এই পর্যটন এলাকা। রেলপথ ও সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই বাজে। সরকারিভাবে পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। পর্যটকদের জন্য শ্রীমঙ্গল ও জেলা শহর ছাড়া ভালো খাবারের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। স্থানীয়ভাবে পর্যটকদের জন্য বিশেষ বাস বা গাড়ির ব্যবস্থা নেই।
শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টের পরিচালক নয়ন আহমেদ বলেন, এ জেলার পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারিভাবে মিউজিয়ামসহ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান নতুনভাবে আবিষ্কার করলে আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে এ জেলার পর্যটন শিল্প। এই শিল্প এগিয়ে গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বেশ প্রভাব ফেলবে। পর্যটনকে ঘিরে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। পর্যটন খাত এগিয়ে গেলে আরও কর্মসংস্থান বাড়বে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ বলেন, ‘জেলায় পর্যটনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি উদ্যোগে শুধু রিসোর্টের সংখ্যাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারিভাবে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে যাতায়াত ব্যবস্থার অবস্থা খুবই নাজুক। এছাড়া বিদেশি পর্যটকেরা এ অঞ্চলে ঘুরতে এলে সুযোগ-সুবিধা খুবই কম পেয়ে থাকেন। পর্যটন নিয়ে ব্যাপক কাজ করলে দেশের পাশাপাশি বিদেশিরা পর্যটক হিসেবে আসবেন এ জেলায়।’
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মিউজিয়াম, শিশু পার্ক স্থাপনসহ বেশকিছু দাবি জানানো হয়েছে। প্রতিটি দাবি বাস্তবায়নের জন্য অর্থের প্রয়োজন। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব পর্যটনের উন্নয়নের ততটুকু কাজ করা হচ্ছে।’
পতাকানিউজ/এমআরআর/এমএম

