দুর্বল হয়ে পড়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের সমস্যা সমাধানে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করেছে সরকার। এর আওতায় এসব ব্যাংকে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে একীভূত করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে অধ্যাদেশে। সে অনুযায়ী সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, সমন্বয়হীনতার কারণে প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে না। আবার অধ্যাদেশে যেভাবে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে বলা আছে, তা অনুসরণ করা হচ্ছে না।
উপদেষ্টা পরিষদ এ বছরের ১৭ এপ্রিল ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন করে। এরপর ৯ মে রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করছে সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম চারটি ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা সবাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
অধ্যাদেশে যা আছে
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে কোনো ব্যাংকের সুবিধাভোগী মালিক যদি ব্যাংকের সম্পদ বা তহবিল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন বা প্রতারণামূলকভাবে অন্যের স্বার্থে ব্যবহার করেন, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি রেজল্যুশনের আওতায় নিতে পারবে। রেজল্যুশন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে দুর্বল যেকোনো ব্যাংকে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু তা-ই নয়, ওই ব্যাংকের বিদ্যমান বা নতুন শেয়ারধারীদের মাধ্যমে মূলধন বাড়ানো যাবে। ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের সুযোগও রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে।
এ ছাড়া যদি কোনো ব্যাংক কার্যকর না থাকে বা সেটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, দেউলিয়া হয়ে যায় বা দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকে, আমানতকারীদের পাওনা দিতে না পারে বা না দেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেটির ভালো করার স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। অধ্যাদেশের ওপর নীতিমালা প্রণয়ন করার কথাও বলা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা রয়েছে, এর অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি আলাদা বিভাগ গঠন করবে।
যেভাবে চলছে ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগ দেন আহসান এইচ মনসুর। এর কিছুদিন পর ১১ সেপ্টেম্বর ব্যাংক খাত সংস্কারে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে সেই টাস্কফোর্সকে ব্যাংক পুনর্গঠন ও রেজল্যুশন ইউনিট গঠন করে। অধ্যাদেশ হওয়ার পর এটি ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগে রূপান্তরিত হয়।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ব্যাংক রেজল্যুশনসংক্রান্ত সব ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকবে। এই ক্ষমতা ও দায়িত্ব ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান কার্যক্রম থেকে পৃথক হওয়ার কথা। অর্থাৎ ব্যাংক রেজল্যুশন কার্যক্রম হবে স্বতন্ত্র। কিন্তু দেখা যাচ্ছে শুরু থেকেই এটি অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে মিশে গেছে। বর্তমানে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন কবির আহাম্মদ। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও ১৩টি বিভাগের ডেপুটি গভর্নর এবং একাধিক কমিটির সদস্য। নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলামও এই বিভাগের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার বাইরে অন্য কাজে তাঁদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
এ ছাড়া এই বিভাগে আরও যাঁদের পদায়ন হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই অনিয়মে জড়িত ব্যাংকগুলোর তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ আছে কারও কারও এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সখ্য থাকার। আবার অনেকে ভবিষ্যতে রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় ধীরগতিতে কাজ করছেন। এতে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার গতি কমে এসেছে। তাতে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের আতঙ্ক আরও বাড়ছে। তা ছাড়া এখনো অধ্যাদেশের ওপর কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি।
একীভূত হওয়া কত দূর
দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে ইতিমধ্যে ওই পাঁচ ব্যাংকের দায় ও সম্পদের প্রকৃত চিত্র বের করা হয়েছে। সরকার পাঁচ ব্যাংককে নিয়ে ‘ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর প্রকল্প কার্যালয় হবে মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে পাঁচ ব্যাংকের দায়, সম্পদ ও জনবল এক করবে। পরে নতুন ব্যাংকটি অধিগ্রহণ করবে। নতুন এই ব্যাংকের মূলধনের বড় অংশ জোগান দেবে সরকার। পরিচালনা পর্ষদে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রাখা হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণ কার্যক্রম পুরো আইনি প্রক্রিয়া মেনে করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন না ওঠে। পাশাপাশি প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করা দরকার, যাতে গ্রাহকেরা আরও আতঙ্কিত না হন। এখানে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।
পতাকানিউজ/কেএস

