আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছাড়াও ভুটানের সেনাবাহিনীও অংশগ্রহণ করে। সে কথা অনেকেই জানেন না। তারা মুক্তিবাহিনীর সাথে মিলে যৌথভাবে অপারেশন চালাত। এই যৌথ বাহিনীর নাম ছিল মিত্রবাহিনী। ১২ ডিসেম্বর ভুটানের সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী প্রথমে এসে আমাদের গ্রামে রসুলাবাদ মাদ্রাসায় অবস্থান নেয়। সকাল দশটার দিকে মিত্রবাহিনী কাটগড় ভোরবাজারে অবস্থান করছিলাম। হঠাৎ মুক্তিবাহিনীর লোকজন বাজারে জোরগলায় সবাইকে বাজার ছেড়ে দ্রুত বাড়িঘরে চলে যাওয়ার আহবান জানিয়ে বলতে থাকেন, ‘এখনই যুদ্ধ শুরু হবে, দ্রুত নিরাপদে চলে যান।’ মূহূর্তেই বাজার খালি হয়ে যায়। মিত্র বাহিনী বাজার সংলগ্ন আরাকান সড়কে এসে অবস্থান নিয়ে আকষ্মিক আক্রমণ শুরু করে পাক সেনাদের উপর। এ সময় ভাঙ্গা ব্রিজ পরিদর্শনরত পাক বাহিনীর স্থানীয় গ্রুপ কমন্ডার কর্নেলসহ তিনজন পাকসেনা নিহত হয়। এরপর শুরু হয়ে যায় উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধ। শঙ্খ নদের উভয় তীরে দীর্ঘ ৪৮ ঘন্টাব্যাপী চলে সম্মুখ যুদ্ধ।
মুক্তিযোদ্ধারা নদের দক্ষিণ তীরে কাটগড় গ্রামে এবং পাক সেনারা উত্তর তীরে দোহাজারীতে অবস্থান নিয়ে এই সম্মুখ সমরে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে পাক বাহিনীর আরো অনেক সদস্য হতাহত হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আমাদের গ্রামের বুকচিড়ে গেছে আরাকান সড়ক। ফলে কাটগড় গ্রামটি পূর্ব কাটগড় ও পশ্চিম কাটগড় নামে পরিচিত। পূর্ব কাটগড় গ্রামে আমাদের দোতলা বাড়ির আড়ালে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প করেন যেন উত্তর দিক থেকে আসা গোলাবারুদ কোনো ক্ষতি করতে না পারে। বাড়ির সামনে কাটগড় প্রাইমারি স্কুলে মুক্তিযোদ্ধারা অ্যাম্বুস বসান। সেখান থেকেই নন স্টপ যুদ্ধ চলতে থাকে। আমাদের বাড়িতে ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দাবার নাস্তার ব্যবস্থা সব আয়োজন করেন আমার মা ও বড় দুই বোন। আমার বাবা আমি এবং আমার ছোট দুই ভাই খাবার বিভিন্ন রসদ সংগ্রহ করে আনি এবং তা যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবেশন করি।
খাওয়ার সময় বা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলে হালকা মেশিন গানের পেছনে আমি এবং অন্যান্য সহযোগীদের বসিয়ে দিয়ে যান মুক্তিযোদ্ধারা। এভাবে টানা ৪৮ ঘণ্টার সম্মুখ সমরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার বিরল সৌভাগ্য লাভ করি। এই যুদ্ধে ভুটানি সেনাবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন গুড়ুং এবং মুক্তিবাহিনীর কামান্ডার ছিলেন আব্দুল গফুর। আব্দুল গফুর পাকিস্তানি এয়ার ফোর্সে চাকরি করতেন, হাছনদন্ডী গ্রামে বাড়ি (ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা)।
আমাদের বাড়িটি ছিল দোতলা, অনেক উঁচু। বাড়ির আড়ালে কাচারি ঘরে অবস্থান নেন এক গ্রুপ। মুক্তিযোদ্ধাদের এই ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধে ভাত, চা নাস্তা খাবার দাবার তৈরির দায়িত্ব আমার মা সানন্দে গ্রহণ করেন। বড় দুই বোন মাকে সহায়তা করে। আমি যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার-দাবার পৌঁছে দিচ্ছি আমার ভাইদের নিয়ে। বাড়িতে চাল ডাল তৈরি তরকারি যা ছিল তা শেষ হয়ে গেলে অবিরাম গোলাবর্ষণের মাঝে ক্রলিং করে গিয়ে ক্ষেত থেকে বেগুন, মরিচ এবং অন্যান্য তরিতরকারি তুলে এনেছি। কাচারি ঘর থেকে স্কুল পর্যন্ত গুলির বাক্স আনা নেয়ার কাজটুকু করেছি। কোনরকম আলস্য বা ক্লান্তিবোধ সেদিন অনুভব করিনি। অবিরাম যুদ্ধের মাঝে খাবারের বিরতিতে রাইফেলের ট্রিগারে হাত রেখে তা চালু রাখার দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধারা মাঝে মধ্যে দিয়েছেন। সেটি পালন করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে না পারার যে তীব্র মনোযাতনা ছিল সেটি কিছুটা হলেও দূর হয়ে গেল।
আমার জেঠাতো ভাই আবুল হোসেন চৌধুরী এই যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন কমান্ডার আব্দুল গফুরের বন্ধু। এছাড়া আমাদের সাথে পাড়ার আবুল কালাম চাষী, আব্দুল মজিদ, আব্দুল আজিজ, আব্দুস সাত্তার, মোতালেব, ওমর আলী, আবুল মনসুরসহ অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আমার বাবা এয়াকুব আলী চৌধুরী, বড় দু বোন শামীম দিলারা চৌধুরী, আঞ্জুমান আরা চৌধুরী এবং ছোট দুই ভাই শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, তমিজ উদ্দীন চৌধুরী এই ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধে নির্ঘুম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দাবার ও রসৎ সরবরাহে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে গেছে। অবিরামগুলি বর্ষণে পাক বাহিনীর ছোড়া মর্টার সেল ও রাইফেলের গুলিতে আমাদের বাড়ির উপরের চালের সমস্ত টিন ঝাঁঝরা হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে দোতলা বাড়ির উপরের ছাদে পাওয়া যায় এসব গুলি ও সেলের খোসা।
মিত্রবাহিনীর সাঁড়াশি প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা পিছু হটে। তারা দোহাজারী থেকে পালিয়ে গিয়ে পটিয়ার আগে পাহাড়ের দিকে আত্মগোপন করে। এই খবর জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর আমরা উল্লাসে ফেটে পড়ি। আশেপাশের সব গ্রামের মানুষ, নারী-পুরুষ বিজয় উল্লাসে রাস্তায় বের হয়ে আসে। লুকিয়ে রাখা বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বের করে সেই বিজয় মিছিলে শরিক হয়ে ভুলে যাই তিন দিনের অবিরাম যুদ্ধে পরিশ্রমের সমস্ত ক্লান্তি অবসাদ। আমি এবং আমার মত যারা এই ৪৮ ঘণ্টার সরাসরি যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছি এবং এতে অংশ নিয়েছি, আমি মনে করি এই সৌভাগ্য অনেকেরই হয়নি। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের অংশ নিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেটও পেয়েছেন। কিন্তু কোন যুদ্ধ তারা দেখেননি, কোন যুদ্ধে তারা অংশ নিতে পারেননি। আমি তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নই। কোনদিন মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কোনদিনও আর এরকম একটি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার বিরল সৌভাগ্য হবে না।
আগেই বলেছি, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রামে মিনি ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করার পর মা-বাবার মত আমি নিজেও বড় দু বোনের নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি শংকিত হয়ে পড়ি। যে কারণে পদুয়া ইউনিয়নের ধলিবিলা গ্রামে আমার নানাবাড়িতে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয়। আমি নিজে গিয়ে রেখে আসি। আমার নানা অছিয়র রহমান চৌধুরী এলাকার খুবই প্রভাব ও প্রতাপশালী লোক। আরাকান সড়ক থেকে চার মাইলেরও বেশি ভেতরে নানাবাড়ি। খরস্রোতা হাঙ্গর খাল পার হয়ে যেতে হয়। ঐ গ্রামের শেষ সীমান্ত বান্দরবানের সাথে সংযুক্ত। পাহাড়ি জনপদের উপজাতীয় বাসিন্দারা এ গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাটে-বাজারে যাতায়ত করে। এখানে নিরাপত্তার শঙ্কা নেই বললেই চলে। বড়বোনদের নিয়ে নানাবাড়িতে পৌঁছে দেখি সেখানে আমার আরেক খালা ওনার ছেলেমেয়েদের নিয়ে আগেই চলে এসেছেন এবং ঝাঁকিয়ে বসেছেন। আমার মায়েরা আপন তিনবোন। এই খালা মায়ের সৎবোন। ওনাকে আগে কখনো দেখিনি। ওনার স্বামী আনসারে চাকরি করেন, মহকুমা অ্যাডজুটেন্ট পদে। খালা স্বামীর কর্মস্থলে থেকেছেন বলে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। ওনার দুই ছেলে, দুই মেয়েসহ এসেছেন। আমাদের দেখে তিনি খুশি হওয়াতো দূরের কথা বিরক্তই হলেন। সেই বিরক্তি তিনি রাখঢাক করেন নি। ওনার দুই ছেলে আমার বড়বোনদের বড়। আমাদের শুনিয়ে খালা আমার মায়ের নাম ধরে বলছেন, ‘ওর মেয়েদের এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে আমার ছেলেদের মাথা খাওয়ার জন্য’। শুধু তাই নয় খাওয়া দাওয়া, ঘুমানোর ব্যবস্থা সব বিষয়ে তিনি আমাদের সাথে অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে থাকেন। এই ঘটনা কিশোর বয়সে আমার মনোজগতে এতো বেশি আঘাত করে যে তা জীবনে কখনোই ভুলতে পারিনি। যা হোক করার কিছু নেই। বাড়িতে মা বাবা একা, সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তা। দুদিন পর আমি ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম। আরাকান সড়কের কাছেই আমাদের বাড়ি। বাড়ি থেকে বের হয়ে সড়কে আসলেই আর্মি ক্যাম্প। তাই যাতায়ত করতে হয় ঘুরপথে, কালিয়াইশ মাস্টারহাট মৌলভীর দোকান হয়ে।
এভাবে আসা-যাওয়ায় চলে যায় কিছুদিন। এদিকে পাক সামরিক জান্তা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিলে কিছুদিন যাইনি, আসা যাওয়ার পথে বারবার হানাদার বাহিনীর চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হবে বলে। পরে আমাকে জানানো হল না গেলে বরং বিপদ বাড়তে পারে। বাড়িঘরে তল্লাশী, অগ্নিসংযোগও হতে পারে। রাজাকার আলবদররা সদা সক্রিয়। তারা পাকসেনাদের কাছে সত্যমিথ্যা মিশিয়ে নানান খবর পৌঁছায়। তাই স্কুলে যাওয়া আসার পথে হানাদার বাহিনীর চেকপোস্টের হালহকিকত সরজমিন দেখে তার রিপোর্ট করতে হবে। শুরু করলাম স্কুলে যাওয়া। সপ্তাহে দুদিন বা তিনদিন যাই। অধিকাংশ সময় আরাকান সড়ক হয়ে গেলে বাড়ি ফিরি চোখের হাট হয়ে। আর চোখের হাট হয়ে গেলে ফিরি আরাকান সড়কে সাঙ্গু ব্রিজ পার হয়ে। তথ্যের আদান প্রদান হয় মূলত চোখের হাটের কাছাকাছি কোথাও। আমি জানি না আমার তথ্য কোথায় পৌঁছায়, নির্দেশনা কোথা থেকে আসে। কিছু জিজ্ঞেস করা নিষেধ।
এভাবে একসময় যুক্ত হয়ে পড়ি গেরিলা গ্রুপের সাথে। বলা চলে আমাকে যুক্ত করে নেয়া হয়। একজন কিশোর হিসেবে গ্রুপের আমি সহযোগী। ২০১১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি- ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা ইউনিয়ন, বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ইউনিট কতৃক ‘মুক্তিযুদ্ধে প্রগতি-যোদ্ধা’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। এটি গ্রন্থনা করেঞছেন পুলক কুমার দাশ এবং সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন ড. মাহবুবুল হক, মোহাম্মদ শাহ আলম, বালাগাত উল্লাহ, অশোক সাহা ও মুক্তিমান বড়ুয়া। এই গ্রন্থের অধ্যায় পাঁচে ‘ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের এফএফ বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ’ পর্বে বৃহত্তর চট্টগ্রামের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তাতে আমাদের তৎপরতার কিছু চিত্র উঠে আসে। যা এখানে তুলে ধরা হল- ‘দোহাজারী: পটিয়া থানার দোহাজারী (বর্তমানে চন্দনাইশ উপজেলাধীন) অঞ্চলে সে সময় ছাত্র ইউনিয়নের ভাল সংগঠন ছিল। ঐ অঞ্চলের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আবদুল গফুর পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পূর্বে তিনি ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আবদুল রশীদ, আবদুল মজিদ, মনোজ সিংহ হাজারী, কল্যাণ চক্রবর্তী, স্বপন মজুমদার, কিরন সরকার, অনিল বড়ুয়া, কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী, মোহাম্মদ মাহফুজ, মোহাম্মদ ইসহাক, মাহবুবুল আজাদ চৌধুরী, জসীম চৌধুরী সবুজ প্রমুখ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গ্রুপ গঠন করেন। তাঁরা দেওয়ানহাটের উত্তরে পাটানিপুল এবং বান্দরবান সড়কে বাজালিয়া মাহালিয়া সেতু উড়ানোসহ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে তাঁদের অনেকে ভারতে চলে যান গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য।’
‘মুক্তিযুদ্ধে প্রগতি-যোদ্ধা’ গ্রন্থে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ন্যাপ- কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে যারা ছিলেন তাঁদের ছবি প্রকাশ করা হয় থানা ভিত্তিক। এতে সাতকানিয়া- লোহাগাড়া থানায় সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার ছবিটি রয়েছে।
সাঙ্গু ব্রিজ পার হয়ে স্কুলে যাওয়া আসার পথে তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্ব পালনরত এক পাকিস্তানি সৈন্য আমার উপর নজর রাখা শুরু করল। সচরাচর ক্যাম্পের উল্টোদিকে হেঁটে যেতাম। একদিন আমাকে ডেকে আমার বইপত্র সব ঘেঁটেগুটে দেখছিলেন। কোথায় কোন ক্লাশে পড়ি তা সহ নানা তথ্য জানতে চান। আমি কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়ি এই ভেবে যে সম্ভবত আমার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু আঁচ করতে পেরেছে, আমাকে সন্দেহ করছে বা কোনো রাজাকার আমার সম্পর্কে রিপোর্ট করেছে। প্রথম দিন কোনভাবে রেহাই পেয়ে স্কুলে পৌঁছলাম। মানিক স্যার ক্লাশ নিতে আসলে ওনাকে জানালাম যে, স্কুলে আসা মনে হয় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মানিক চৌধুরী স্যার বড়ুয়া সম্প্রদায়ের। হিন্দুরা সব পালালেও পাঞ্জাবি সৈন্যদের কাছে তারা চাইনিজ বুড্ডিস্ট পরিচয়ে নিরাপদ। স্যার সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে ঘুরপথে আসা যাওয়ার জন্য বললেন। সপ্তাহে একদিন বা দুদিন স্কুলে যাই ঘুরপথে। কিন্তু এতে আমার খবরাখবর সংগ্রহ কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। অতএব ঝুঁকি নিয়ে আবার ব্রিজের দুদিকে দুটি সেনা চৌকি অতিক্রম করে আসা যাওয়া শুরু করি যেদিন আমার খবর দেওয়ার পালা থাকে। বারবারই সেই সৈন্যের সামনে পড়ে যাই এবং তিনি বারবার আমাকে ডেকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করেন। একদিন তিনি আমাকে ডেকে কথাবার্তা বলে আমার হাতে কয়েকটা চকলেট (লেবেনচুস বলতাম) হাতে দিলেন। তা হাতে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করি। কিছুদূর গিয়ে চকলেট কয়টা ছুঁড়ে ফেলে দিই মনের ভেতরে সন্দেহ থেকে।
তাছাড়া পথেঘাটে কেউ কিছু দিলে তা না নেয়ার জন্য মায়ের কড়া নির্দেশ ছোটবেলা থেকেই ছিল। মনে মনে এই সৈন্যটাকে বিপদ হিসেবে দেখতে লাগলাম। তাকে যতই এড়াতে চাই ততই তার সামনে পড়ে যাই। এরমধ্যে যুদ্ধ তুমুলভাবে শুরু হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা হামলায় অস্থির হানাদার বাহিনী। তারা বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাদের মনোবলে চিড় ধরছে। এ রকম অস্থির সময়ে একদিন আবার সেই সৈন্যের মুখোমুখি পড়ে যাই। তিনি কাছে ডাকলেন আমাকে। অনেকদিন আমাকে দেখেন নি, কোথায় ছিলাম, কি করেছি এসব জানতে চাইলে আমার ভয় এবার সত্যি ভয় করতে শুরু করল। কারণ এ ক’দিনে আমাদের এলাকায় হানাদার বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে মুক্তিবাহিনীর দুবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। তল্লাশি চৌকিতে কোন সময়ে কতজন পাঞ্জাবি সৈন্য কে কোন পজিশনে থাকে এসব তথ্য আমি জানিয়ছি। মনে হচ্ছিল ধরা পড়ে গেলাম বোধহয়।
এবার সেই সৈন্য আমাকে কাছে টেনে মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তোমারি এয়সা মেরে এক সাওয়াল থা।’ উর্দু তখন কিছুটা বুঝলেও বলতে পারি না। ফলে তার বয়ানটুকু হুবুহু বলতে পারছি না। তিনি উর্দুতে বলে চললেন, ‘আমার ছেলেও এবার ক্লাশ টেনে উঠবে। দেখতে তোমার মতনই গড়ন। তোমাকে দেখলে আমার সন্তানের চেহারাটি চোখের সামনে ভেসে উঠে।’ এ সময় তাঁর দু চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। পকেট থেকে দ্রুত রুমাল বের করে চোখ মুছে নিয়ে নিজেকে সিন্ধি পরিচয় দিয়ে জানান, তাঁর নাম আবদুল আজিজ এবং বাড়ি পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে। কাতর কন্ঠে তিনি বললেন, ‘আমি জানি না আমি এখান থেকে জীবন নিয়ে দেশে ফিরতে পারব কিনা। জানি না আমার ছেলের মুখ আর কোনোদিন আমার দেখা হবে কিনা।’
কথা শেষ করে হাত ছেড়ে দিয়ে এবার আমার হাতে কয়েকটা চকলেট গুঁজে দিয়ে জানালেন, কয়েকদিন ধরে আমাকে খুঁজছেন এগুলো পকেটে নিয়ে। আবদুল আজিজের মত আমার দু’চোখের কোণায় জমে থাকা অশ্রু লুকাতে আমি তাড়াতাড়ি স্কুলের পথে পা বাড়াই।
১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে শঙ্খ নদের দক্ষিণ তীরে আমার গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর অবস্থান এবং উত্তর তীরে দোহাজারীতে পাক হানদার বাহিনী অবস্থান নিয়ে ৪৮ ঘণ্টার সন্মুখ সমরের কথা আগেই বলেছি। যে যুদ্ধে সপরিবার আমার অংশগ্রহণের বিরল সুযোগ হয়। এই যুদ্ধে আমাদের পক্ষে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ১৪ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী পিছু হটে। তারা পটিয়ার দিকে পাহাড়ি অঞ্চলে পালিয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বর আমরা লাল সবুজ পতাকা নিয়ে কমান্ডার আবদুল গফুরের নেতৃত্বে সামিল হই বিজয় মিছিলে। ১৪ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় সাতকানিয়া-পটিয়া এলাকা। দোহাজারীতে শত্রুপক্ষের বাঙ্কার থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সাতজন পাকিস্তানি সেনাসদস্যের লাশ উদ্ধার করে। আমার দেখার বা জানার সু্যোগ হয়নি এই সাতজনের মধ্যে সিন্ধি সেনা আবদুল আজিজের লাশ ছিল কিনা। যে ৯৩ হাজার বন্দী পাকিস্তানি সেনাকে তাদের দেশে ফেরত দেয়া হয়েছিল সেখানে আবদুল আজিজও ছিলেন কিনা, দেশে ফিরে তাঁর সন্তানকে পরম আদরে বুকে টেনে নিতে পেরেছিলেন কিনা।
সাতকানিয়ার কাটগড়ের যুদ্ধে অংশ নেয়া ভূটানি সেনাদল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অবস্থান করতে থাকে আমাদের গ্রামে সিঅ্যান্ডবি অফিস কম্পাউন্ডে। ভারতীয় সেনাবাহিনী এদেশ থেকে প্রত্যাহার শুরু হওয়ার পর ১৯৭২ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি ভুটানি সেনাদল আমাদের গ্রাম ছাড়ে দেশের উদ্দেশ্যে। তারা চার মাসের মত থেকেছে সিঅ্যান্ডবি অফিসে। এ সময় গ্রামের মানুষের সাথে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাদের সাথে বিকেলে আমরা ভলিবল খেলতাম। গ্রামের লোকজন তরিতরকারি, চালডাল, মুরগী, পিঠাপুলি ইত্যাদি তাদের জন্য উপহার হিসেবে এনে দিয়ে যেতেন।
আমাদের গ্রামের নাম কাটগড়। মোগল বাহিনী এখানে কাঠের গড় বা দুর্গ নির্মাণ করে অবস্থান নিয়ছিল বলে এর নাম কাটগড় হয়। মোগল বাহিনী ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুুদ্ধের সময় জাপানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে এই গ্রামে রয়েল ব্রিটিশ বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। নেপালি গুর্খা সেনাদল ব্রিটিশ বাহিনির হয়ে যুদ্ধ করেছে দীর্ঘদিন এই ক্যাম্পে অবস্থান নিয়ে। আমার বাবার মুখে শুনেছি, গুর্খা সেনাবাহিনীর রসদপত্র মজুদ রাখার জন্য বিশাল গুদাম ঘর, তাদের থাকার ব্যারাক, অস্ত্রাগার সবই ছিল। সৈন্যসামন্তের রসদপত্র টানার জন্য ছিল খচ্চরের পাল। খচ্চরের পিটে করে সৈন্যরাও বিভিন্ন স্থানে যাতায়ত করত। সেইসব স্মৃতির ঐতিহাসিক স্থানগুলির সবকটিই শঙ্খ নদের ক্রমাগত ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
পতাকানিউজ/কেএস

