অবশেষে সাকিব আল হাসানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে মাঠের বাইরের বাস্তবতা যেখানে বেশি আলোচিত, সেখানে পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজ কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক লড়াই নয়—এটি হয়ে উঠছে সাকিব–ফেরার সম্ভাব্য দরজা।
বোর্ডের সাম্প্রতিক অবস্থানে স্পষ্ট হয়েছে, সাকিবকে জাতীয় দলে ফেরানোর ইচ্ছা এখন আর গোপন নয়। বরং সেটিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সময়ও বেছে নেওয়া হয়েছে। মার্চে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ—এই সময়টিকেই লক্ষ্য ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্রিকেটীয় বিবেচনায় এটি কতটা যৌক্তিক, আর বাস্তবতায় কতটা সম্ভব?
সাকিব নিজকে নিজের নাম শুধু ক্রিকেটের খাতায় লেখাননি। একই সঙ্গে তিনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনীতির খাতায় নিজের নাম লেখান। সংসদ সদস্য পদও উপহার পান আওয়ামী লীগের কাছ থেকে। বির্তকিত নির্বাচনে উপহার পাওয়া সংসদ সদস্য পদই যেন কাল হয়ে দাঁড়ায় সাকিবের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে। বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার হারিয়ে যেতে বসেন রাজনীতির চোরাবালিতে। একের পর মামলা যুক্ত হয় তার নামে পাশে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় তিনি দেশে ছিলেন না। ফলে কারাগারে যাওয়া থেকে আপাতত রক্ষা পেলেও এখন ক্রিকেট মাঠে ফেরার আলোচনার মধ্যেই নতুনভাবে আইনি প্রক্রিয়া আলোচনায় এসেছে। মামলার আসামি কিভাবে দেশে এসে নির্বিঘ্নে ক্রিকেট খেলবে? –এই আইনি যুক্তি খন্ডন করতে দ্বারস্ত হতে হচ্ছে ক্রীড়া উপদেষ্টা এবং আইন উপদেষ্টার কাছে। যদিও এখন দুটি পদেই একই ব্যক্তি আসীন। তিনি কিভাবে সাকিবকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে খেলার মাঠে ব্যাট-বল হাতে পাঠাবেন-সেটাই এখন দর্শকদের দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্রিকেটার সাকিব এখনো প্রাসঙ্গিক
ফর্ম, ফিটনেস ও অভিজ্ঞতা—এই তিন জায়গায় সাকিব আল হাসান এখনো বাংলাদেশের ক্রিকেটে ব্যতিক্রমী এক নাম। বিশেষ করে ওয়ানডে ফরম্যাটে তাঁর বিকল্প তৈরি হয়নি বললেই চলে। বাঁহাতি অলরাউন্ডারের অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের মতো শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে—এটা বিসিবির ক্রিকেটীয় যুক্তির বড় অংশ।
তবে সমস্যা ক্রিকেটে নয়, বাইরে
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দেশে না থাকা, একাধিক মামলা, রাজনৈতিক পরিচয়—সব মিলিয়ে সাকিবের ফেরা কখনোই কেবল নির্বাচকদের টেবিলের সিদ্ধান্ত ছিল না। আগের বোর্ডগুলো চাইলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে পারেনি। বর্তমান বোর্ড তুলনামূলকভাবে সরাসরি পথে হাঁটছে।
বোর্ডের এক পরিচালক গণমাধ্যমকে বলেন, সাকিবকে দলে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত মূলত ক্রিকেটীয়, তবে বাস্তবতা সামলাতে সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এখানেই বোঝা যায়—সাকিবের ফেরাটা নির্বাচকদের নয়, বরং সরকারের সিদ্ধান্তও লাগবে।

কেন পাকিস্তান সিরিজ?
এই সিরিজের সময়টাই বিসিবির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মার্চে সিরিজটি সীমিত পরিসরের, ওয়ানডে ফরম্যাটে এবং ঘরের মাঠে। মানে—চাপ কম, নিয়ন্ত্রণ বেশি। এর পর পিএসএল শেষে টেস্ট সিরিজ আলাদা অধ্যায়। বিসিবির পরিকল্পনায় তাই প্রথম ধাপ হিসেবেই ওয়ানডে সিরিজকে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে এই সিরিজ সাকিবের জন্যও প্রতীকী হতে পারে। দেশের মাঠে শেষবারের মতো খেলার ইচ্ছা তিনি আগেও প্রকাশ করেছেন। সেটি পূরণ হলে তা হবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের বড় এক অধ্যায়।
রাজনীতি, প্রশাসন ও ক্রিকেট—এক সুতায় বাঁধা
বিসিবির ধারণা, বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোতে বিষয়টি নিয়ে এগোনো তুলনামূলক সহজ। যদিও মামলার বাস্তবতা এখনো বদলায়নি, তবু রাজনৈতিক সমীকরণ বদলানোয় বোর্ড আশাবাদী। বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সময় খুব কম হলেও প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে অনেক কিছুই সহজ হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সমীকরণ কি নির্বাচনের আগেই মেলানো যাবে, নাকি সবকিছু আবার অনিশ্চয়তার দোলাচলে পড়বে?
কারণ, সাকিব আল হাসান এখন আর কেবল একজন ক্রিকেটার নন; তিনি একাধিক বাস্তবতার প্রতীক। তাঁকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত মানে কেবল দলে একজন অলরাউন্ডার যোগ করা নয়—এটি বিসিবির সক্ষমতা, সাহস ও কৌশলের বড় পরীক্ষা।
পাকিস্তান সিরিজ তাই শুধুই ক্রিকেট নয়। এটি বোঝাবে, বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসন মাঠের বাইরের চাপ সামলে মাঠের খেলাকে কতটা অগ্রাধিকার দিতে পারে। আর সেই পরীক্ষার কেন্দ্রে আছেন—সাকিব আল হাসান।
-পতাকানিউজ

