শনিবার বিকেল পাঁচটা। হাঁটছিলাম চকরিয়া পৌরশহরের ওয়াপদা সড়কে। রোজকার দিনের মতোই সবকিছু স্বাভাবিক। কর্মব্যস্ত মানুষ। কেউ কেনাকাটায় ব্যস্ত। কেউ বা আপন কর্মে। আবার কেউ বা সওদাই শেষে ধরেছে বাড়ির পথ।
আমিও হাঁটছি আপন মনে। সাংবাদিকের চোখ যেদিকে যায়, যেন সংবাদই খুঁজে। নাক যেন নিজের ঘ্রাণ খুঁজতেই ব্যস্ত। এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমি কিছুটা বাকরুদ্ধ। কিছুটা স্তম্ভিত।
যা দেখলাম, তা নিজের চোখে দেখেছি বলে বিশ্বাস করলাম। কিন্তু নিজের বিবেক আমাকে তাড়া দিলো, তুমিও কাজটি করতে পারতে। কী এমন ক্ষতি হতো যদি নিজেই এগিয়ে যেতে। অন্যরা যেখানে দর্শকের মতো ছিলেন, তুমিও সেখানে অন্যের লজ্জা নিবারণে এগিয়ে যেতে পারতে। হোক, তিনি পাগলী। তারপরও তিনি তো মানুষ। মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানেই তো মানবতা।
আমি যা দেখেছি, তা আত্মবিশ্লেষণ করতে গিয়েই কখন যে কিছুটা সময় বেশি ব্যয় করেছি বুঝতে পারিনি। এবার এগিয়ে গেলাম সেই পাগলীর দিকে। আমার আগ্রহ যতো না পাগলীকে ঘিরে, তার চেয়ে বেশি পাগলীর পাশে থাকা এক তরুণীকে ঘিরে। কারণ, আমাকে বিস্মিত করে যে কাজটি তিনি করেছেন, সেটা শুধু মানবিক বললে হবে না, বলতে হবে অতি মানবিক।
যে পাগলীর কথা বলছি, তাকে চকরিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়। মুখ চেনা। শরীরে কাপড় থাকে না। দিগম্বর থাকেন প্রায়ই। কিন্তু স্থানীয়রা দিগম্বর পাগলীকে নিয়ে বাড়তি কিছু কখনো ভেবেছেন বলে মনে হয়নি।
আজ একজন তরুণী ওই দিগম্বর পাগলীকে নিয়ে ভেবেছেন। শুধু ভাবেননি, এমন কিছু করেছেন, যা দেখে একটু আগে আমার মনে হয়েছিল, কাজটি আমিও করতে পারতাম। বা করা দরকার ছিল। নিজস্ব চিন্তাকালে যেন চপেটাঘাত খেলাম।
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, ওই তরুণী পাগলীকে দিগম্বর দেখে পাশের দোকান থেকে নতুন কাপড় কিনলেন। তারপর নিজ হাতে পাগলীর শরীরে নতুন কাপড় পড়িয়ে দিলেন। আশপাশের মানুষগুলো যারা এতোক্ষণ নিজ কর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তাদের এবার কর্মধ্যান ভাঙলো। তারাও বিস্ময়ের সঙ্গে তরুণীর কর্ম দেখলেন। এরপর উপস্থিত জনতা বাহবা দিচ্ছিলেন তরুণীকে ঘিরে। তার কর্মের জন্য।
আমি আরো খানিকটা এগিয়ে গেলাম। মানে, যুবতীর কাছে গেলাম। পরিচয় জানতে চাইলাম। এতে তরুণী কিছুটা যেন বিস্মিত হলেন। কিংবা কথা বলতে সংকোচবোধ করলেন বলে মনো হলো।
সংক্ষেপে যতোটুকু জানালেন, তার মর্মার্থ হলো, তিনি রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা। চাকরি করেন মহেশখালীর কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে। চকরিয়া পৌরসদরে ভাড়া বাসায় বাস করেন। নাম মিতু।

তরুণী আর কোনো তথ্য দিলেন না। মানে তথ্য দিতে কিংবা গাগলীর প্রতি মানবিকতার বিষয়েও কোনো মন্তব্য করলেন না। তিনি পাগলীর গায়ে নতুন কাপড় পড়িয়ে দেলেন। নিজের প্রয়োজনীয় বাজার সওদা করে আপন ফিরে গেলেন নিজের বাসায়।
তিনি শুধু কর্ম দিয়েই বুঝিয়ে দিলেন ‘মানুষ মানুষের জন্য’। মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধার প্রতি তার মানবিকতা দেখে অন্যরা যেন শিক্ষা গ্রহণ করলেন। যে কাজটি স্থানীয়দের কেউ একজন করতে পারতেন, সেই কাজটিই রাজধানীর বাসিন্দা এই তরুণী করে দেখালেন। আর দেখানোর পর তিনি হাঁটলেন আপন জগতে।
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম আরো কিছুক্ষণ। কেন দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটা তখন বুঝিনি। অবশ্য আমার মনের আয়নায় অন্য একটি গল্পের চিত্র উঠে এলো। পুরনো দিনের স্মৃতির জানালা মেলে দেখলাম, অনেক দিন আগে আরেক পাগলীকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন দুজন মানুষ। সেই সময় এক পাগলী আহত হয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে গিয়েছিলেন। সেই পাগলীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শিবু দাশ ও মোহাম্মদ নূরুল আমিন নামের দুজন মহৎ মানুষ। তারা দীর্ঘদিন এই পাগলীর চিকিৎসা এবং খাওয়ার বিষয়টি তদারকি করেছিলেন। নিজদের উদ্যোগে এবং নিজদের টাকায় পাগলীর ঔষধ এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করে তারা মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
আজ মিতু নামের এই তরুণীর কর্ম দেখে শিবু এবং আমিন দুজনেই আমার মানসপটে ভেসে উঠলো। তারা তিনজনকেই কর্ম দিয়ে নিজদের আত্মপরিচয় দিয়েছেন।
ভাবছি, সব মানুষের মধ্যে যদি এমন মানবিক মনুষ্যত্ববোধ জেগে উঠতো, তাহলে সোনার বাংলাদেশের উন্নয়ন কতোই না ত্বরান্বিত হতো!
লেখক : এম জাহেদ চৌধুরী, সংবাদকর্মী।
-পতাকানিউজ

