সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এখন জলাবদ্ধতাময়। চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার পানির ছবি ও ভিডিও ঘুরছে ফেসবুকে। এর মধ্যে কিছু ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এমন বাস্তবতায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে, অনেকেই করেছেন তীর্যক মন্তব্য, জানিয়েছেন ক্ষোভও।
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল সকাল ১০টার পর শুরু হয় বৃষ্টি। টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে চকবাজার, কাতালগঞ্জ, প্রবর্তক মোড় ও মুরাদ এলাকা হাঁটু থেকে বুক সমান পানিতে তলিয়ে যায়।
এরপর এসব এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগের বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিও ফেসবুকে তুলে ধরেন বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীদের অনেকেই। মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় নানা সমালোচনা।
এদিকে আজ বেশি ভাইরাল হয়েছে নগরীর প্রবর্তক মোড় এলাকার ছবি ও ভিডিও। সেখানে কোমর থেকে বুক সমান পানি জমেছিল। আর এতে ভোগান্তির শেষ ছিল না ওই পথ ব্যবহারীদের।
এছাড়া নগরীর জিইসির মোড় এলাকার একটি নালায় একজন পথচারী পড়ে যাওয়ার ভিডিও এবং নগরীর জুবিলী রোড তিন পুলের মাথা এলাকায় পানিতে বাস যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল ভেসে যাওয়ার একটি ভিডিও ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মী শামসুদ্দিন ইলিয়াস নিজের ফেসবুকে প্রবর্তক মোড় এলাকার তিনটি ছবিসহ লিখেন, চট্টগ্রাম নগরী। জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প শেষ পর্যায়ে। প্রকল্প শেষে পর্যায়ে এ হাল!!!
সেই পোস্টের মন্তব্যে শারমিন রিমা নামে একজন লিখেন, জলের টাকা জলেই যায়, বোনাস হিসাবে কয়েকটা তাজা প্রাণও নিয়ে যায়।
সাইফ ইউ আলম নামে আরেকজন সেখানে মন্তব্য করেন, ১২ বছরেও উন্নতি হয়নি।
নগরীর চকবাজার কাপাসগোলার এলাকার একটি ভিডিও ফেসবেুকে আপলোড করে মোহাম্মদ গফুর নামে একজন লিখেন, ‘মাননীয় মেয়র মহাদয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি আমাদের চকবাজার এলাকায় যে হিজড়া কালের বাদ দেওয়া আছে ঐটা খুলে দিলে এ বৃষ্টির পানিগুলো চলে যাওয়ার ব্যবস্থা হতো।’
প্রবর্তক মোড় এলাকার কয়েকটি ছবি নিজের ফেসবুকে দিয়ে মোস্তফা জাহেদ লিখেন, এক পশলা বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম অচল, জলাবদ্ধতায় নাকাল মানুষ।
নিপুল কুমার দে নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী রিকশায় যাওয়ার সময় ‘বাসায় যাচ্ছি শিরোনামে’ জামালখান বাই লেন এলাকার একটি দুর্ভোগের ভিডিও চিত্র তুলে ধরেন।
এদিকে আজকের টানা বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকার বাসাবাড়ি, মার্কেট, দোকানপাট সবখানেই ঢুকে পড়েছে পানি। পানিবন্দি হয়ে অলস সময় পার করেছেন অনেকেই। এমন ছবিও ঘুরছে ফেসবুকে।
এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বৃষ্টিতে ভিজে পানি মাড়িয়ে চলার এমন অসংখ্য ছবি দিয়েছেন অনেকে।
পানিতে বাবার কাঁধে ছাতা হাতে একজন স্কুলছাত্রের ছবি দিয়ে চক্রবর্তী কমল নামে একজন তার ফেসবুকে লিখেন, অসহায় নগরবাসী! বুক সমান পানিতে বাবা। আর বাবার কাঁধে চড়ে বাসায় ফিরছে স্কুল পড়ুয়া ছেলে। এ চিত্র চট্টগ্রাম নগরীর বেশির ভাগ এলাকার! কোথাও হাঁটু সমান, কেথাও কোমর সমান আবার কেথাও গলা/ বুক সমান পানিতে তলিয়ে গেছে নগরী। সীমাহীন দুর্ভোগ!
‘বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতা শিরোনামে’ রাজীব রাহুল নামে একজন নিজের ফেসবুক পেজে লিখেন ‘নগরীতে একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, আর সঙ্গে শুরু হয় জনদুর্ভোগের চরম চিত্র। রাস্তা ডুবে যায়, যানজট বাড়ে, মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয় প্রতিনিয়ত। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে অল্প বৃষ্টিতেই নগরী জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে বড় কারণ হলো খাল-নালা ও ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকা। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। শুধু কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নয়, আমাদেরও সচেতন হতে হবে। যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেললে এ সমস্যা কখনোই কমবে না। জনসচেতনতা বাড়লে, নিয়মিত খাল-ড্রেন পরিষ্কার হলে এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তবেই মিলবে স্থায়ী সমাধান।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, আজ সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ (তিন) নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বন্দর নগরীর চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেকে মেগা প্রকল্প অনুমোদন হয়। এরপর ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এর অধীনে শুরু হয় প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৮,৬২৬ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫,৬১৬ কোটি টাকা। প্রকল্প মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রকল্প ব্যয় আরও ৩ হাজার ১০ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ৮,৬২৬ কোটি টাকা করা হয়। মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ আর দুই মাস।
এদিকে, গত ১৯ এপ্রিল থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্ষাকে সামনে রেখে নগরীর খাল-নালা পরিষ্কার কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
পতাকানিউজ/আরবি

