রাজবধু হওয়ার পর পেয়েছিলেন রাজকীয় জীবনের স্বাদ। লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে। তারপরও পাহাড়ে ফিরে হাল ধরেছেন পাহাড়ের উন্নয়নে। পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছেন রাজনীতিতে।
পাহাড়ের তরে জীবন সঁপে দেওয়া এই নারীর নাম মাম্যাচিং। বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর রাজনীতির অলিগলি পেরিয়ে হলেন সংসদ সদস্য। গেলেন জাতীয় সংসদে। পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে রেখেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। তারপর জেলা পরিষদের নেতৃত্বও দিয়েছেন। সংসদ সদস্য এবং জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান—দুই পদে দায়িত্ব পালনের সময়ই নিরন্তর কাজ করেছেন পাহাড়ের উন্নয়নে।
রাজনৈতিকভাবে তিনি বিএনপি নেত্রী। বান্দরবান জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। আর নারী হিসেবে অনন্যা। কারণ, তিনি পাহাড়ের উন্নয়নে কখনো বৈষম্য করেননি। পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে দূরত্ব রাখেননি। ফলে পুরো পাহাড়ি মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন। সেটা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার।
তবে রাজনীতির গিরিপথ পাড়ি দিতে গিয়ে মামলার শিকার হয়েছেন। হেনস্তা হয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মীদের আগলে রাখতে গিয়ে বারবার বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি নেতা-কর্মীদের আগলে রেখেছেন। তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছেন, বটবৃক্ষ হয়ে নেতা-কর্মীদের রেখেছেন ‘ছায়ায়।’
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ নতুন সরকার পেয়েছে। বিএনপি দেশের চালকের আসনে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে কে আসছেন—এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে বান্দরবানজুড়ে। নানাজন নানামাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন নাম উচ্চারণ করছেন। উচ্চারিত নামগুলোর মধ্যে সর্বাধিক উচ্চারিত হচ্ছে ‘মাম্যাচিং’।
আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলন ও বিএনপির দুর্দিনে মাম্যাচিংয়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী দুঃশাসনের সময় রাজপথে থেকে দলের কর্মসূচি পালন থেকে শুরু করে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। রাজপরিবারের সন্তান হলেও আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে বিএনপির জন্য হুলিয়া মাথায় নিয়ে ফেরারি জীবন বেছে নিয়েছিলেন।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে রাজনীতিতে নাম লেখান মাম্যাচিং। এরপর ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৭ সাল এবং ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বান্দরবান জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আর ২০১২ সাল থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির উপজাতীয় বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে মাম্যাচিং মাত্র ৮৫৩ ভোটে পরাজিত হন।
ওই নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন রাজপুত্র সাচিংপ্রু। তিনি ভোট পেয়েছিলেন ১৪ হাজার। সেই নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলে ১৪ হাজার ভোট মাম্যাচিংয়ের ভোটবাক্সে যুক্ত হতো এবং বিএনপি জয়ী হতো।
একাধিক বিএনপি নেতার অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সম্পর্কে শ্যালক ও সমন্ধির আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। শালা-সমন্ধি মিলে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং লুটপাটের পরিষদ গড়ে তুলেছিল। সেটির পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠী। আত্মীয়করণ পুনর্বাসন বাদ দিয়ে দলের দুঃসময়ের ত্যাগীদের মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন নেতারা।
জেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন শাহীন বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ স্থানীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকেই চেয়ারম্যান পদে আসীন করা উচিত। সেক্ষেত্রে দলের পরীক্ষিত সৈনিক মাম্যাচিংয়ের বিকল্প নেই। অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতায় সবার চেয়ে এগিয়ে তিনি।
সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক চনুমং মারমা বলেন, পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিএনপির পরীক্ষিত সৈনিক হিসেবে পরিচিত মাম্যাচিং দিদিকে চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব দেওয়া হোক। তিনিই এ পদের জন্য উপযুক্ত ও যোগ্য দাবিদার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের নাম ছড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। আত্মীয়করণ কখনোই দলের নেতা-কর্মীরা মেনে নেবে না।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. জাবেদ রেজা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সম্প্রদায়ে বিএনপির দুজন মুরব্বি রয়েছেন। তাদের একজন সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী। অন্যজন মাম্যাচিং। শেষ বয়সেও দলের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক মামলায় নির্যাতিত মাম্যাচিংকে মূল্যায়নের সময় এখন।
আমাদের দাবি, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা বিবেচনায় তাকে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে মূল্যায়ন করবে দল। মাম্যাচিং দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির পরীক্ষিত নেত্রী। তিনি কখনোই দলের বিরুদ্ধে যাননি। পাহাড়ি বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং বাঙালিদের আস্থাশীল নেত্রী মাম্যাচিং মূল্যায়িত হবেন—এটিই আমার বিশ্বাস।‘
-পতাকানিউজ/আরআর

