পুনরায় শুরু হয়েছে ফুটবল কিংবদন্তি আর্জেন্টিনার ‘ফুটবল ঈশ্বর’ দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর ‘নরহত্যা’র অভিযোগে দায়ের করা মামলার বিচার। একজন বিচারকের নৈতিক স্খলনজনিত কেলেঙ্কারিতে আগের শুনানি বাতিল হওয়ার প্রায় এক বছর পর মঙ্গলবার থেকে নতুন করে এই বিচার কার্যক্রম শুরু হল। ফলে বিষয়টি ফুটবল বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার গণমাধ্যম নাসিওন, ক্লারিন ও ইনফোবায়ের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসেছে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে। ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর, মাত্র ৬০ বছর বয়সে ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পর বুয়েনস আইরেসের টিগ্রে এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসনে ছিলেন তিনি। অস্ত্রোপচারের প্রায় দুই সপ্তাহ পর হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ফুসফুসে পানি জমার কারণে তাঁর মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ উঠতেই ঘটনাটি আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ম্যারাডোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত সাত সদস্যের মেডিকেল টিম তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’র মামলা দায়ের করা হয়। নতুন করে শুরু হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ায় চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও নার্সসহ অভিযুক্ত সাতজনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। আদালতে প্রায় ১২০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের ৮ থেকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
তবে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, ম্যারাডোনার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক এবং তাঁর দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতার ফল। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অগাস্টিনা কোসাশভের আইনজীবী ভাদিম মিশানচুক বলেছেন, ম্যারাডোনাকে হত্যার কোনো পরিকল্পনা ছিল না এবং এমন অভিযোগ পরিবার ও অভিযুক্তদের প্রতি অন্যায় আচরণ।
এই মামলার আগের বিচারপ্রক্রিয়া গত বছর বড় ধরনের বিতর্কে থমকে যায়। মামলার তদারকিতে থাকা বিচারক জুলিয়েটা মাকিনটাক একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পেশাগত নৈতিকতা ভঙ্গের দায়ে তাঁকে পদচ্যুত করা হয় এবং ২০২৫ সালের মে মাসে আগের বিচার বাতিল ঘোষণা করা হয়। ফলে নতুন করে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।

ম্যারাডোনার মৃত্যু শুধু একটি আইনি মামলা নয়; এটি আর্জেন্টিনার জাতীয় আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফুটবল ইতিহাসে তাঁর অবদান তাঁকে দেশটির সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর মাধ্যমে তিনি বিশ্ব ফুটবলে অমর হয়ে আছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই টুর্নামেন্টে তাঁর করা দুটি গোল-একটি ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং অন্যটি একক নৈপুণ্যে করা গোল-ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
ক্লাব ফুটবলেও ম্যারাডোনার প্রভাব ছিল অসাধারণ। ইতালির নাপোলি ক্লাবকে তিনি প্রথমবারের মতো সিরি আ শিরোপা এনে দেন, যা তাঁকে শহরটির কিংবদন্তিতে পরিণত করে। দরিদ্র পাড়ার শিশু থেকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ওঠার গল্প তাঁকে কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা জোগায়।
তবে তাঁর জীবন ছিল আলো–অন্ধকারে ভরা। মাদকাসক্তি, স্বাস্থ্যগত জটিলতা ও বিতর্কিত ব্যক্তিগত জীবন তাঁকে বারবার খবরের শিরোনামে এনেছে। মৃত্যুর আগের বছরগুলোতে তিনি হৃদ্রোগ, স্থূলতা ও আসক্তির সমস্যায় ভুগছিলেন। ফলে তাঁর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।
ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর মহামারির কঠিন সময়ে লাখো আর্জেন্টাইন রাস্তায় নেমে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। রাজধানীর প্রেসিডেন্ট ভবনে তাঁর মরদেহ শায়িত রাখা হয়, যেখানে মানুষের ঢল নেমেছিল। সেই আবেগ এখনও ম্লান হয়নি, আর নতুন করে শুরু হওয়া বিচারপ্রক্রিয়া আবারও জাতিকে সেই স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়েছে।

নতুন এই বিচার আগামী জুলাই পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আদালতের রায় শুধু সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর ভাগ্যই নির্ধারণ করবে না; এটি ম্যারাডোনার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কেরও অবসান ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফুটবল মাঠের জাদুকর হলেও ব্যক্তিজীবনে ছিল উত্থান–পতনে ভরা এক নাটকীয় গল্প। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া দিয়েগো ম্যারাডোনা খুব অল্প বয়সেই বিশ্বজোড়া খ্যাতি পান, কিন্তু সেই খ্যাতির চাপ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বারবার আলোচনায় নিয়ে আসে।
১৯৯১ সালে কোকেন ব্যবহার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে ব্যর্থ হওয়া—এসব ঘটনা তাঁর ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনকেও নাড়িয়ে দেয়। তবু তিনি বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন এবং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে প্রকাশ্যে চিকিৎসা নিয়েছেন।
পরিবার ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ম্যারাডোনার জীবন ছিল জটিল। তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী ক্লাউদিয়া ভিয়াফানিয়ের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের স্বীকৃতি নিয়ে আইনি লড়াই এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে আসা পারিবারিক দ্বন্দ্ব তাঁকে বারবার শিরোনামে এনেছে।
জীবনের শেষ দিকে তিনি সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন এবং পরিবারকে ঘিরেই সময় কাটাতে চেয়েছিলেন। জীবনের শেষ পর্বে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তিনি চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ছিলেন—যা শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিতর্ক ও আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
-পতাকানিউজ

