প্রতিবছর রমজান মাস শুরুর আগে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ভোক্তাদের গলা কাটার জন্য ভোগ্যপণ্য ‘জলে ভাসিয়ে’ রেখে ফাঁদ তৈরি করেন। কৃত্রিম সেই ফাঁদের নাম ‘জলে ভাসা গুদাম।’ লাইটার জাহাজে আমদানিকৃত পণ্য ভাসিয়ে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয় বাজারে। এরপর চড়া মূল্যে ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করা হয়। এই চড়া মূল্যের সঙ্গে আদায় করে নেওয়া হয় লাইটার জাহাজে গড়ে তোলা কৃত্রিম গুদামের যাবতীয় ব্যয়। এসব ব্যয় সরাসরি ভোক্তাদের ঘাড়ে পড়ে। ফলে ভোক্তারা হয় চিড়ে-চেপ্টা।
অতীতের মতো এবারও লাইটার জাহাজে ভোগ্যপণ্য ভাসিয়ে রেখে জলে ভাসা গুদাম সৃষ্টি করেছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এবার নতুনত্ব হলো, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে আমদানি। রোজা শুরুর তিন সপ্তাহেরও আগে এখন পর্যন্ত সাগরে ভাসছে প্রায় ২৫ লাখ টন খাদ্যপণ্য। এসব পণ্য স্বাভাবিকভাবে খালাস করে সারা দেশের বাজারে পৌঁছাতেও কয়েক সপ্তাহ সময়ের ব্যাপার। এখন রমজান শুরুর আগে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যগুলো নানা কূটচাতুরিমূলক যুক্তিতে সাগরে ভাসিয়ে রাখা হয়েছে।
এতে সরকারও অনেক সময় বিপাকে পড়ে। জনরোষ সৃষ্টি হয়। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন ভোক্তারা। চাপে পড়ে সরকার। আর লাভবান হন কতিপয় ব্যবসায়ী।
চলতি বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া আমদানির কারণে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন ঘাট ও গুদামে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে নদীপথে পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম লাইটার জাহাজের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত বহির্নোঙরে অবস্থানরত ১০৪টি পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে ৪৬টিই ছিল ভোগ্যপণ্যবাহী। এসব জাহাজে মোট ভোগ্যপণ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার টনে। এক বছর আগে একই সময়ে যেখানে ২৬টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন ভোগ্যপণ্য ছিল, সেখানে এবার জাহাজ ও পণ্যের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। এখন পর্যন্ত খালাস হয়েছে সাড়ে ১০ লাখ টনের মতো, আর খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় পৌনে ১৩ লাখ টন পণ্য।
গমেই সর্বোচ্চ চাপ
আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে গম। বন্দরে থাকা ২৫টি জাহাজে এসেছে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টন গম, যার মধ্যে খালাস করা গেছে ৫ লাখ ৮০ হাজার টন। ছোলা, মসুর ও মটর ডালবাহী ৭টি জাহাজে এসেছে ২ লাখ ৩৬ হাজার টন, আর ৯টি জাহাজে এসেছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার টন তৈলবীজ। তবে লাইটার সংকটের অজুহাতে এসব পণ্যের বড় অংশই এখনও সাগরে বা ঘাটে আটকে আছে। লাইটার জাহাজ সংকটের মূল কারণই হলো বেশ কিছু ভোগ্যপণ্য খালাস না করে লাইটার জাহাজে করে সাগর বা নদীতে ভাসিয়ে রাখা।

বন্দরসংশ্লিষ্টদের দাবি, এবার শুধু আমদানির পরিমাণ বাড়েনি, বরং অনেক নতুন আমদানিকারকও বাজারে এসেছে। কিন্তু তাদের বড় অংশেরই নিজস্ব গুদাম বা সংরক্ষণব্যবস্থা নেই। ফলে বড় জাহাজ থেকে লাইটারে পণ্য ওঠানোর পর নির্ধারিত ঘাটে দ্রুত খালাস সম্ভব হচ্ছে না। এতে লাইটার জাহাজগুলো দিনের পর দিন আটকে থাকছে, নতুন জাহাজের জন্য বরাদ্দ মিলছে না।
লাইটার গুদাম, মিলছে না খালি লাইটার
ডব্লিউটিসিসির ২৫ জানুয়ারির প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন ঘাটে ১০ দিন থেকে দেড় মাস ধরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আটকে আছে ২৬৫টি লাইটার জাহাজ। এর মধ্যে ১২২টিই ভোগ্যপণ্যবাহী। গত ১১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ‘শুভরাজ–৮’ নামে যে লাইটার গম নিয়ে যাত্রা করেছিল, সেই জাহাজ এখনো খালি হয়নি। ওই গম নারায়ণগঞ্জের নদীতে অবস্থান করছে। মানে, ৪২ দিন ধরে জাহাজটি গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে অসংখ্য লাইটার ভোগ্যপণ্য নিয়ে ভাসছে। কিন্তু পণ্য খালাস করা হচ্ছে না। ফলে নিয়মিতভাবে যেসব লাইটার জাহাজ প্রয়োজন, সেগুলো যথাসময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো–অর্ডিনেশন সেলের (ডব্লিউটিসিসি) আওতায় কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০টি লাইটার জাহাজ সক্রিয় ছিল, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১ হাজার ২২টিতে। অথচ রোজাকে ঘিরে আমদানির চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ।
বড় গ্রুপ বনাম ছোট আমদানিকারক
সরবরাহব্যবস্থায় তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে কয়েকটি বড় শিল্পগ্রুপ। যাদের নিজস্ব লাইটার ও আধুনিক ঘাট রয়েছে, তারা এক–দুই দিনের মধ্যেই পণ্য খালাস করতে পারছে। মেঘনা, সিটি, টি কে বা আকিজ গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানে ক্রেন সুবিধা থাকায় জট অনেকটাই কম। তবে যেসব বড় গ্রুপের নিজস্ব লাইটার নেই বা সংখ্যা কম, তারাও এখন বরাদ্দ সংকটে পড়েছে। মঙ্গলবার ২৪টি বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য কোনো লাইটারই বরাদ্দ পায়নি আমদানিকারকেরা।
প্রভাব রোজার বাজারে
বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুদাম ও ঘাটে জলাবদ্ধতা, দীর্ঘ খালাস সময় এবং বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। রমজান মাসে যখন চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে, তখন সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাতও বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়। পণ্য দেরিতে বাজারে আসায় ব্যবসায়ীদের গুদাম ভাড়া, লাইটার ডেমারেজ ও শ্রম ব্যয় বাড়ছে—সবকিছুই ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ে।
চাপে পড়ে সরকার
কিছু ব্যবসায়ীর এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বাজারে সংকট তৈরি হয় এবং দাম বাড়ে। ফলে জনরোষ সৃষ্টি হয়। এতে সরকার চাপে পড়ে। এবার অবশ্য ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলতে পারে রমজান মাসে। এই সময়টিকে কৌশলে ‘অনৈতিকভাবে আয়ের পথ’ বানিয়ে বেশি মুনাফা করার প্রচেষ্টা চালাতে পারেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। নির্বাচনকালীন ব্যস্ততার কারণে বাজার তদারকি কমতে পারে—এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা হাতিয়ে নিয়ে ভোক্তাদের ভোগান্তিতে ফেলতে পারেন—এমন শঙ্কাও করা হচ্ছে।
দ্রুত খালাসে তাগিদ
ডব্লিউটিসিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, আমদানি বেড়েছে কিন্তু লাইটারের সংখ্যা কমেছে। পাশাপাশি বেশিরভাগ ঘাটে এখনও সনাতন পদ্ধতিতে পণ্য খালাস হওয়ায় সময় বেশি লাগছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য খালাস ও গুদাম ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
-পতাকানিউজ

