নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এবং বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর বক্তব্যের পর চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সমস্যার সমাধান ও দাবি-দাওয়া পূরণ না হলে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে—এমনটাই জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এদিকে টানা কর্মবিরতির পর পুরনো ছন্দে ফিরেছে চট্টগ্রাম বন্দর। শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়ায় বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। এতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে।
সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিটি প্রবেশমুখে প্রাইভমুভার, কাভার্ডভ্যানসহ গাড়ির দীর্ঘ সারি। বিভিন্ন জেটিতে সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা শুরু হয়েছে। পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রমও চলছে সকাল থেকে বন্দরের ভেতরে ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন প্রবেশ করেছে।
এর আগে রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের সমন্বয়ক মো. হুমায়ূন কবীর ও মো. ইব্রাহীম খোকনের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মঘট স্থগিতের কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি নিয়ে উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এবং বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সাংবাদিকদের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী বর্তমান সরকারের আমলে এনসিটি চুক্তি না করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সন্তোষজনক আলোচনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য রিলিজের স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ধর্মঘট কর্মসূচি ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পাঁচ কর্মচারীকে গ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক মামলা, ১৫ কর্মচারীকে বিভিন্ন বন্দরে বদলি, আন্দোলনরত কর্মচারীদের শাস্তি, বাসা বরাদ্দ বাতিল এবং ১৬ কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্তসহ যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এসব সমস্যার সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এ বিষয়ে সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘বন্দরের স্বার্থ, দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে। তবে আমাদের দাবিগুলো পূরণ না হলে আবারও নতুন কর্মসূচি দেয়া হতে পারে।’
এর আগে সর্বশেষ রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এতে বন্দরের তিনটি টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামাসহ প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করতেই এ ধর্মঘট চলছে। আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো মানার মতো নয়। রমজান সামনে রেখে যেকোনো মূল্যে চট্টগ্রাম বন্দর সচল রাখা হবে।’
তিনি বলেন, ‘কিছু লোক চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। তবে বন্দর সচল রাখতে সরকার হার্ডলাইনে আছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা বাধা দেবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
একইদিন বেলা সাড়ে ১২টায় বন্দর ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে বলে জানান। ‘তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভের ব্যানারে একাংশ কর্মচারী বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত করে কার্যত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি ‘হাইজ্যাক’ করেছে এবং জনস্বার্থকে জিম্মি করে রেখেছে। চলমান আন্দোলন এমন একটি প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা, যা এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যারা এসব করছে তারা রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং রমজানের আগে জনমনে অসন্তোষ তৈরির পরিকল্পনা করছে।’
এদিকে টানা কর্মবিরতির কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দর চত্বর ও জেটিতে থাকা ১০টি জাহাজ এবং বেসরকারি ডিপোতে আটকে পড়ে প্রায় ১৩ হাজার একক রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার। এসব কন্টেইনারে থাকা পণ্যের আনুমানিক মূল্য ৬৬ কোটি ডলার বা ৮ হাজার কোটি টাকা।
ধর্মঘটের কারণে অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে খোলা চিঠি দেয় চার ব্যবসায়ী সংগঠন। শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন উদ্বেগ জানায়।
টানা দুদিন বিরতির পর শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর বোট ক্লাবে আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের বৈঠকের পর দুদিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করে সংগ্রাম পরিষদ।
তারও আগেও মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পালন করা হয় ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি।
আন্দোলনের মাঝে আন্দোলরত কর্মচারীদের একের পর এক বদলি করা হয়। সর্বশেষ সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ১৫ কর্মচারীকে একসঙ্গে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়।
এদিকে আন্দোলনে জড়িত ১৫ শ্রমিক-কর্মচারীকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পাশাপাশি তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দম কমিশনের (দুদক) কাছে আবেদন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
প্রসঙ্গত, গত ২৯ জানুয়ারি এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা রুল হাইকোর্ট খারিজ করে দেন। এরপর ৩১ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ডাকে কর্মবিরতি পালিত হয়।
পতাকানিউজ/আরবি

