ইসলাম মানব সমাজে শালীনতা, পরিমিতি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ধর্ম। এটি শুধু ইবাদত নয়, বরং জীবনযাত্রার নান্দনিক ও নৈতিক দিকগুলোও নির্ধারণ করে। পুরুষ ও নারীর পোশাক, আচরণ, অলঙ্কার- সব ক্ষেত্রেই ইসলাম একটি স্পষ্ট পার্থক্য রেখেছে।
ইসলামে গয়না বা অলংকার ব্যবহার নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠে আসে, বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে। অনেকেই জানতে চান, আংটি, চেইন বা কানের দুল পরা কি ইসলামে বৈধ, নাকি তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ? ইসলামি শরিয়তের আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই স্পষ্ট।
নবী করিম (সা.) এর এক হাদিসে এসেছে, তিনি এক হাতে সিল্ক ও অন্য হাতে সোনা ধরে বলেন, ‘এই দুইটি জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম, আর নারীদের জন্য হালাল।’ (ইবনে মাজাহ)
ইসলামে সোনা পরা সাধারণভাবে বৈধ হলেও এর সঙ্গে কিছু শর্ত ও সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে পুরুষদের জন্যে সোনার আংটি বা সোনার চেইন হারাম বলে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে।
যদিও ধম স্বর্ণ পরার নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে এতে সাজসজ্জার সীমা ও শালীনতার নীতি সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত। আল্লাহ বলেন, ‘বল, কে হারাম করেছে আল্লাহর সৌন্দর্যোপকরণ, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র জীবনোপকরণ।’ (সুরা আ‘রাফ, আয়াত: ৩২)
ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “সাজসজ্জা বা সৌন্দর্যোপকরণ বৈধ, তবে তা এমনভাবে হতে হবে যাতে শরিয়তের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করে। পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ও রেশম সেই সীমা অতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত।” (তাফসির ইবনে কাসির, সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা)
রাসুল (সা.)- এর জীবন থেকে আমরা এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাই। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, ‘নবীজি রেশম ও স্বর্ণ পরিধান থেকে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন— ‘এই দুটি জিনিস আমার উম্মতের নারীদের জন্য বৈধ, কিন্তু পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৫৭; সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৫৯৫)
ইসলাম পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার হারাম করলেও শর্তসাপেক্ষে রুপা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। রুপা ব্যবহারের প্রধান শর্তটি হলো- রূপার পরিমাণ এক মিসকালের চেয়ে কম অর্থাৎ সাড়ে চার মাশার চেয়ে কম হতে হবে। গ্রামের হিসাবে এক মিসকালের পরিমাণ হলো ৪.৩৭৪ গ্রাম। (ফতোয়ায়ে কাজি খান: ৩/৪১৩)
এক ব্যক্তি পিতলের আংটি পরে নবী (স.) এর নিকট আসলে তিনি তাকে বলেন, ব্যাপার কি, আমি তোমার থেকে মূর্তির গন্ধ পাচ্ছি কেন? এ কথা শুনে সে ব্যক্তি তা খুলে ফেলে দেয়। এরপর সে একটি লোহার আংটি পরে আসলে, তিনি তাকে বলেন, আমি তোমাকে জাহান্নামিদের অলংকার পরা অবস্থায় দেখছি! তখন সে তা খুলে ফেলে দেয় এবং বলে- ইয়া রসুলুল্লাহ! আমি কী ধরনের আংটি ব্যবহার করবো? জবাবে (সা.) বলেন, ‘এক মিসকাল (৪.৩৭৪ গ্রাম) ওজনের কম রুপা দিয়ে আংটি তৈরি করে তা ব্যবহার করো।’ (আবু দাউদ: ৪২২৩ তিরমিজি: ১৭৮৫ নাসায়ি: ৫১৯৫)
ইবনে আব্বাস (রা.) একটি হাদিসে বর্ণনা করেন, ‘নবীজি এক ব্যক্তির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে তা খুলে ফেলে দেন এবং বলেন, ‘তুমি কি (দোজখের) আগুনের টুকরা হাতে নিতে চাও? (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৯০)
চারটি প্রধান মাজহাব, হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি- সবগুলোর আলেমগণ একমত যে, পুরুষদের জন্য স্বর্ণ পরা বৈধ নয়।
এগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে পুরুষদের জন্য স্বর্ণের ব্যবহার শরীয়তসম্মত নয়, বরং এটি জাহান্নামের আগুনের প্রতীক হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
পতাকানিউজ/এএইচ

