চট্টগ্রাম মহানগরীর গণবেকারি মোড়। বেকারির উল্টোপাশেই অবস্থান কিউসি নামক পেট্রোল পাম্পের। মোটরসাইকেল আরোহীদের কাছে একটি বেশ জনপ্রিয় এ পাম্প। পাম্পটির সুখ্যাতির কারণে স্বাভাবিক সময়েও এখানে দীর্ঘ সারি থাকে মোটরসাইকেল আরোহীদের।
এখন পরিস্থিতি পরির্বতন হয়েছে। সারাদেশের মতো তেল সংকটে হাহাকার অবস্থা চট্টগ্রামেও। ফলে মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেটকারের দীর্ঘ লাইন পড়েছে পাম্পের আশপাশে। এতোটা দূরে গেছে লাইন, সেখান থেকে একজন চালক বললেন, ‘পেট্রোল পাম্প বহুদূর।’
পেট্রোল পাম্প বহুদূর- এর কারণ সবার জানা। কিন্তু বাস্তবিক সমাধান কবে আসবে? –সেটাই গ্রাহকদের অজানা।
বাস্তবতা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে তেল সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ফলে পাম্প গুলোতে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও সরকার বলছে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই।
এরই মধ্যে আশার খবর হলো, চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানিবাহী জাহাজ থেকে খালাস কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ দেশের পথে রয়েছে। গতকাল ভারত থেকে ৫ হাজার টন ডিজেল এসেছে। আরো আসবে। সরকার একাধিক বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তাছাড়া ইরান আশ্বাস দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশমুখী তেলের জাহাজ আসতে পারবে। সেগুলোতে দেশটি বাধা দেবে না। তবে আগে থেকে তথ্য জানাতে হবে ইরানকে।
চট্টগ্রাম বন্দরে তেল খালাসের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার অ্যান্ড মেরিন সদস্য কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বুধবার এক ব্রিফিংয়ে জানান, বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙরে ছয়টি জাহাজ থেকে এলপিজি, এলএনজি ও জ্বালানি তেল খালাস করা হচ্ছে। এছাড়া জ্বালানিবাহী আরও চারটি জাহাজ বাংলাদেশে আসার পথে রয়েছে।
তিনি জানান, এসব জাহাজের মধ্যে একটি বুধবার এবং বাকি তিনটির মধ্যে দুটি ১২ মার্চ ও একটি ১৪ মার্চ বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং বহির্নোঙরে অবস্থানরত মাদার ভেসেলের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভাগীয় শহরগুলোতে অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আগে যেখানে গড় বিক্রির তুলনায় ২৫ শতাংশ কম সরবরাহ করা হচ্ছিল, তা কমিয়ে এখন ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে কার্যত সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

তবে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের পরও রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন কমেনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে চালকদের। আবার অনেক পাম্প এখন বন্ধ রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানা এলাকার মীর ফিলিং স্টেশনে গিয়ে অকটেন কিনতে পারেননি মোটরসাইকেল চালক নূরুল আনোয়ার। তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরেও অকটেন পাইনি। মীর ফিলিংয়ে গিয়ে তেল চাইলে পাম্পের ব্যবস্থাপক উল্টো ধমক দেন। বলেন, ‘এক কোটি টাকার পে অর্ডার দেবো, গিয়ে পদ্মা থেকে তেল এনে দেন।’ নূরুল আনোয়ার এর প্রতিবাদ করে বলেন, ‘আমি কেন পদ্মা থেকে তেল আনবো? আপনারা ডিলার, আপনারা আনবেন, আমরা ক্রেতারা কিনবো। এটাই তো নিয়ম।’ এই নিয়ে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে সেখানে পুলিশ পৌঁছে এবং নূরুল আনোয়ারকে সান্ত্বনা দিয়ে ফিলিয়ে দেয়। কিন্তু তেল দেয়নি। আবার কোনো কোনো মোটরসাইকেল চালক জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘ লাইন ধরে সময় ব্যয় করে ২৫০ টাকার তেল কিনতে পেরেছেন।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে নৌপরিবহনেও। চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌরুটে জ্বালানি সংকটের কারণে স্পিডবোট চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে স্পিডবোট না চলায় যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে। যদিও ট্রলার, ফেরি এবং বিআইডব্লিউটিসির জাহাজ এমভি মালঞ্চ চলাচল করছে। এই রুটের প্রায় ৯০ শতাংশ যাত্রী সাধারণত স্পিডবোটে যাতায়াত করেন।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর জ্বালানি তেলের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার লিটার ডিজেল বিক্রি হয়েছিল, সেখানে চলতি মার্চের প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৭ হাজার ৮৯৯ লিটার ডিজেল বিক্রি হয়েছে। এছাড়া অকটেন ও পেট্রোল বিক্রিও বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে ১৩ থেকে ৭১ দিনের চাহিদা পূরণের মতো জ্বালানি মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অকটেন রয়েছে প্রায় ২৩ হাজার টন, যা ২৫ দিন এবং পেট্রোল রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ১৭ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে।

অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) জানিয়েছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে থাকা মজুত জ্বালানি দিয়ে সর্বোচ্চ আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল মজুত ছিল।
জ্বালানির বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে কোথাও মজুত রেখে বিক্রি বন্ধ রাখার প্রমাণ পাওয়ায় সতর্ক করা হয়েছে। একইসঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী জ্বালানি বিক্রি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
–পতাকানিউজ

