পেন্টাগনের একটি ই-মেইল ফাঁস হওয়ার পর এখন ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ফাটল নিয়ে বেশ আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ন্যাটো থেকে স্পেন থেকে বাদ দেওয়ার চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের ফারদ যে কতোখানি কমেছে-সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে ধারণা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
ফাঁস হওয়া ওই ইমেইলে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান, এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশের ভূমিকা নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইমেইলটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, ইউরোপের একাধিক মিত্র দেশ -বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালির ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বলে জানা গেছে। ওই সামরিক অভিযানে ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্রদের সক্রিয় সমর্থন না পাওয়ায় ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে। ইমেইলে দাবি করা হয়, ইউরোপের এসব দেশ “যুদ্ধকালীন দায়িত্ব” পালনে পিছিয়ে রয়েছে, যা মিত্র জোটের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি করছে।`
ফাঁস হওয়া নথির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশে স্পেনকে নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পেনকে ন্যাটো থেকে বহিষ্কারের সম্ভাব্য আলোচনার কথাও উল্লেখ রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। যদিও ন্যাটো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করেছে, জোটের প্রতিষ্ঠাতা চুক্তিতে কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে বহিষ্কার বা স্থগিত করার বিধান নেই।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, “জোটের আইনে সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের কোনো ব্যবস্থা নেই।” ফলে পেন্টাগনের ইমেইলে উল্লিখিত সুপারিশ বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তার সরকার কোনো ফাঁস হওয়া ইমেইলের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে না। তিনি বলেন, “আমরা সরকারি নথি ও আনুষ্ঠানিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাজ করি।”
ইউরোপের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাজ্যও এই কূটনৈতিক উত্তেজনার বাইরে নেই। ইমেইলে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়েও অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার পরামর্শ উল্লেখ করা হয়। ফকল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সার্বভৌমত্ব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে বলেছেন, যুদ্ধ বা চাপের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যকে কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতে জড়ানো যাবে না। লন্ডন থেকেও জানানো হয়েছে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের সার্বভৌম অঞ্চলের অংশ এবং এ অবস্থান পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।

১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র বলেন, “দ্বীপবাসীরা গণভোটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থাকতে চেয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই এখানে প্রধান বিষয়।”
ইমেইল ফাঁসের পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র কি তার মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি পশ্চিমা জোটের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের বেশি উঠেছে, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে অঞ্চলে মার্কিন নৌ ও বিমান শক্তির উপস্থিতি আরও জোরদার হয়েছে। সামরিক কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই অঞ্চলে তিনটি বড় মার্কিন রণতরী সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইমেইল ফাঁস, ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েন, ইরান যুদ্ধ এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এক জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে।
এই জটিলতা আরো বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনাকে ঘিরে। শুক্রবার রাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছিলেন, ইরান নতুন করে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনার জন্য পাকিস্তানে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদেরও তিনি পাকিস্তান পাঠাচ্ছেন। আলোচনায় একটি চুক্তি হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।

কিন্তু ইরান ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়েছে। দেশটি দাবি করছে, ইরান এখনো এমন কোনো প্রস্তাব দেয়নি এবং চুক্তির বিষয়ে তারা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমতাবস্থায় ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারণারকে অনেকটা গুরুত্বহীন করে তোলছে। কারণ, তিনি দিনে একাধিক বার নানা ধরনের বক্তব্য প্রচার করছেন, যেসব বক্তব্যের মধ্যে একটির সঙ্গে অন্যটির মিল থাকছে না।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান এখনো বিপরীতমুখী অবস্থান করায় যুদ্ধাবস্থা প্রকৃতপক্ষে কোনো দিকে মোড় নিচ্ছে সেটা বলা এখন বেশ মুশকিল। ফলে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে।
তথ্য সূত্র : রয়টার্স
-পতাকানিউজ

