চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ ইয়াসিন প্রকাশ্যে ‘জনবিস্ফোরণ’-এর হুমকি দিয়ে ফের আলোচনায় এসেছেন। র্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মতো গুরুতর ঘটনার পরও এলাকায় নিজের কার্যালয়ে বসে প্রশাসনের উদ্দেশে দম্ভোক্তি ও হুঁশিয়ারি দিতে দেখা গেছে তাঁকে।
শুধু তাই নয়, অতীতে এই ‘সন্ত্রাসী জনপদে’ অভিযান চালাতে গিয়ে এক জেলা প্রশাসকের কী পরিণতি হয়েছিল—সেটিও নিজের বক্তব্যে তুলে ধরে প্রশাসনকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন ইয়াসিন।
গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ইয়াসিনকে বলতে শোনা যায়, জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের নামে নির্বিচারে গ্রেপ্তার মেনে নেওয়া হবে না। অভিযানের আগে আসামির নাম ও ঠিকানা জানানো না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘এসব ক্রাইমের ফান্দে পাড়া দিয়া কেউ যদি ঝামেলা করে, এতে বড় ধরনের জনবিস্ফোরণ ঘটবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভিডিওটি বুধবার বিকেলে ধারণ করা। ওই দিন জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে নিজের কার্যালয়ে বসে প্রায় ২৯ মিনিট ধরে বক্তব্য দেন ইয়াসিন। সেই বক্তব্যেই একাধিকবার প্রশাসনের বিরুদ্ধে হুমকিমূলক কথা বলেন তিনি।
ভিডিওতে ইয়াসিন নিজেকে সন্ত্রাসী নন দাবি করে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের জমি তাঁদের ক্রয় করা সম্পত্তি এবং সেখান থেকে তাঁদের উচ্ছেদ করা যাবে না। তিনি আরও দাবি করেন, এর আগে এক সাবেক জেলা প্রশাসক সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ‘উধাও’ হয়ে গেছেন।
‘জনবিস্ফোরণ’-এর আশঙ্কার কথা তুলে ধরে ইয়াসিন বলেন, এলাকায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি গত সোমবার জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত র্যাব অভিযানের উদ্দেশ্য ও সততা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। কেন ওই এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখার দাবিও জানান তিনি।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনকে জঙ্গল সলিমপুরের অস্থির পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেন।
উল্লেখ্য, গত সোমবার বিকেল চারটার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এ ঘটনায় বুধবার রাতে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করে র্যাব। মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামি ধরতে গেলে ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় র্যাবের হেফাজতে থাকা এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। চার র্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হলে পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়।
জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে অবস্থিত। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই এলাকা সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের একেবারে কাছেই অবস্থান করায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী চক্রের দখলে রয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় জঙ্গল সলিমপুর ধীরে ধীরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে হাজারো অবৈধ বসতি। পাহাড় কাটা ও প্লট-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বাহিনীর কড়া পাহারায় এলাকাটি প্রায় সবসময়ই সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
র্যাব অভিযানের আগেও জঙ্গল সলিমপুরে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের অক্টোবরে দুটি পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এর পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক।

পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বর্তমানে দুটি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয়। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন, অন্যটির নেতৃত্বে রয়েছেন রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন।
সাম্প্রতিক ভিডিওতে ইয়াসিন দাবি করেন, রোকন উদ্দিনের ‘খুঁটির জোর’ বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ইয়াসিন নিজেকেও আসলাম চৌধুরীর অনুসারী বলে দাবি করে আসছেন। তবে এ বিষয়ে মঙ্গলবার গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে আসলাম চৌধুরী স্পষ্ট করে জানান, জঙ্গল সলিমপুরে তাঁর কোনো অনুসারী নেই এবং এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।
ইয়াসিনের প্রকাশ্য হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইয়াসিন আলীনগরের কার্যালয়ে বসে এসব বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
র্যাবের অভিযানের বিষয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান বলেন, ‘৫০ জনের বেশি র্যাব সদস্য নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে—এমন ধারণা থেকেই তারা সেখানে যান। ঘটনার পর একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। অভিযানে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।’
পতাকানিউজ/এসএমআর

