আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার এমন ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে শুরু করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত ৩ নভেম্বর বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। সেই তালিকায় চট্টগ্রাম ৮ আসনের প্রার্থী হিসেবে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর নাম ঘোষিত হয়।
মনোনয়ন পেয়ে মুখের হাসি প্রশস্ত করে এরশাদ উল্লাহ জনসংযোগ শুরু করেন। কিন্তু বিধিবাম। শুরুতেই এই প্রার্থীকে পড়তে হলো অস্ত্রের মুখে। বুকে সন্ত্রাসীর গুলি বিদ্ধ হয়ে তিনি এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চট্টগ্রাম থেকে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারযোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে ঢাকায়।
অবশ্য, ওইদিন গুলির ঘটনায় আরো দুজন বিদ্ধ হয়েছিলেন। এদের একজন এরশাদ উল্লাহর সহযোগী ইরফানুল হক শান্ত। তাঁর মাথা ও গায়ে চারটি গুলি লাগে। অন্যজন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলা। তার মাথা, ঘাড়, পেট, পিটে ৭টি গুলিবিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে সরোয়ার বাবলাকে হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরশাদ উল্লাহ এবং শান্তকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়।
প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা
গত ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রাতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এই ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করে আসামিদের ধরতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন।
অবশ্য, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পরদিন বুধবার রাতে সরোয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে দ্বিতীয় দফায় গুলির ঘটনা ঘটে। ওই রাতে মাদক কারবারীদের বাধা দেয়ায় প্রতিবন্ধী অটোচালক ইদ্রিসকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। আবার, একই রাতে মহানগরীর বাইরে রাউজান উপজেলার কোয়েপাড়া এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন রাউজান উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ সুমন, ইউনিয়ন কৃষক দলের সহসভাপতি মো. ইসমাইল, শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খোরশেদ আলম চৌধুরী, যুবদলের সহসভাপতি রবিউল হোসেন রুবেল ও বিএনপি কর্মী মোহাম্মদ সোহেল।
রাউজানের ঘটনায় বিএনপি নেতা গিয়াস কাদের চৌধুরী এবং গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীদের বিরোধ বলে প্রাথমিক তথ্যে প্রকাশ পায়।
মানে, এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় থেকে পরর্বতী ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২টি ঘটনায় চারজন এবং রাউজানে ১টি ঘটনায় ৫ জনসহ মোট ৯ জন গুলিবিদ্ধ হন। এদের মধ্যে সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলার মৃত্যু হয়।

প্রথম ঘটনা তথা এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই প্রধান উপদেষ্টা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই নির্দেশনার পরের রাতে আরো দুটি ঘটনায় ৬ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ‘চাপ’ বাড়ে। তাই অপরাধ বিশেষজ্ঞরা ধরেই নিয়েছিলেন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ এবং জেলা পুলিশ ‘চুম্বক গতির’ অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে।
কারণ, ইতোপূর্বে চট্টগ্রাম মহানগর এবং রাউজানে ধারাবাহিক অপরাধের ঘটনাগুলোর ‘ক্ষত’ এখনো শুকায়নি। সেসব ঘটনার রেশ কাটার আগেই বিএনপি প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনাটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’র ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়।
এই ঘটনায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সঙ্গে উঠে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক কঠোর ও সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, এখানে একটি চক্র যারা আগামীদিনের নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে। বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এটা ফেলে দেয়ার মতো কথা না। লোকজন যখন বলছে -এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। যারা ষড়যন্ত্র করছে তারা কি এই সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে।’
এমতবস্থায়, সরকার এবং রাজনৈতিক দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুলিশের ‘চুম্বক’ গতির অভিযানে অপরাধীরা ধরা পড়বে -এমন প্রত্যাশার পারদ বাড়ে জনমনে। কিন্তু ঘটনার তিনদিন পার হলেও পুলিশের তরফ থেকে বড় ধরনের সাফল্যের খবর পায়নি দেশবাসী।
র্যাবের ‘ক্ষিপ্রগতির’ অভিযান
পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘চুম্বক গতির’ অভিযানের তথ্য দেশের মানুষ না পেলেও র্যাব দিয়েছে ‘ক্ষিপ্রগতির’ অভিযানের খবর। শুক্রবার দুপুরে র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, তিনটি ঘটনায় ৯ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনটিতেই প্রাথমিক সাফল্য পেয়েছে র্যাব। গ্রেপ্তার হয়েছে ৬ জন আসামি। উদ্ধার হয়েছে পিস্তল-গুলি।

র্যাব অধিনায়ক বলেন, অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনটি ঘটনার আসামিকে আইনে আওতায় আনা হয়েছে। অন্য আসামিদের ধরতে র্যাবের অভিযান অব্যাহত আছে।
র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ এবং সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলার এজহারভুক্ত ৫ এবং ৬ নম্বর আসামি আলাউদ্দিন ও মাছ হেলাল গ্রেপ্তার হয়েছে র্যাবের অভিযানে। এছাড়া ৬ নভেম্বর রাতে একই এলাকায় অটোচালক মো. ইদ্রিসকে গুলি করার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে সন্ত্রাসী মো. আরমান আলী রাজ।
মহানগরীর দুটি ঘটনায় তিন আসামিকে গ্রেপ্তার ছাড়াও রাউজানে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘাতে জড়িত তিন জনকে গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা রাউজানে গুলি চালিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার থানার সিরাজউদ্দৌলা সড়কের চন্দনপুরা এলাকার একটি বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন। তথ্য পেয়ে র্যাব ইসতিয়াক চৌধুরী অভি, মো. জনি এবং মাহমুদুল হক জ্যাকিকে গ্রেপ্তার করে। এই সময় তাদের হেফাজত থেকে একটি বিদেশী পিস্তল এবং চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়।
র্যাব এমন এক সময়ে ‘ক্ষিপ্রগতি’র ঝলক দেখাল যখন র্যাব বাহিনী বিলুপ্তির দাবি উচ্চারিত হচ্ছে। বাহিনীটি বিলুপ্ত হবে নাকি সংস্কার হবে-সেই বিষয়েও দেশবাসীকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়নি সরকার তরফ থেকে। জাতিসংঘের গুম বিষয়ক কমিশন থেকে শুরু করে দেশের একাধিক রাজনৈতিক দল এবং মানবাধিকার সংস্থা র্যাবের বিলুপ্তি চায়। কারণ, র্যাবের বিরুদ্ধে ‘ক্রসফায়ার’ এবং ‘গুমের’ অভিযোগ উঠেছে।
-এমন বাস্তবতা নিয়েই মাঠে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে র্যাব। হালসময়ে অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির পর প্রধান উপদেষ্টা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়। সেই নির্দেশনা পেয়ে র্যাব আরেক দফা ‘ক্ষিপ্রগতির’ ঝলক দেখালো।
যা বলছেন মানবাধিকার নেতা
তিন ঘটনায় র্যাবের অভিযানে ৬ আসামি গ্রেপ্তারের পর জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্ত্বি ফিরেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান।
পতাকানিউজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে দেশে অস্ত্রের ঝনঝনানি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন -এটা নির্বাচনী মাঠের জন্য বড় ধরনের আশঙ্কার খবর। প্রায় ১৫ বছর পর দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য আশায় বুক বেঁধে আছেন। এমতাবস্থায় এমন অস্ত্রবাজি চলতে থাকলে ভোট দিতে পারবেন কি না তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশকে এখনো সক্রিয় করা যাচ্ছে না। এটা ঠিক পুলিশের প্রতি মানুষের ক্ষোভ ছিল। কিন্তু এখন তো সব কিছু স্বাভাবিক। পুলিশের উচিত এখনই জিরো ট্রলারেন্সে যাওয়া। পুলিশ এখন মাঠে স্বাভাবিক দায়িত্বপালন করছে। তারপরও অপরাধ বাড়ছে। কিছুদিন আগে অপারেশন ডেভিল হান্ট চলেছে দেশে। কিন্তু দেশের মানুষ এটাকে ‘ইদুর বিড়াল’ খেলার মতোই দেখেছে। বাস্তবে অবৈধ অস্ত্র মাঠে রয়ে গেছে। পুলিশ যদি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেনা সদস্যের সহযোগিতা চায়, নিশ্চয় সেটাও পাবে। তারপরও অপরাধ দমনে পুলিশকে সক্রিয় হতে হবে। এর বিকল্প নেই।’ অল্প সময়ের মধ্যেই তিন ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টিকে ‘র্যাবের সক্রিয়তার প্রমাণ’ হিসেবে দেখছেন এই মানবাধিকার আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘র্যাব সক্রিয় হয়েছে-এটা স্বস্ত্বির খবর। এখন অবশ্যই পুলিশকে সক্রিয় হতে হবে। না হলে নির্বাচনের মাঠ শান্ত রাখা যাবে না। এছাড়া তালিকা তৈরি করে শতভাগ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ অস্ত্র মাঠে রেখে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়।’

