বাংলাদেশের নীল দিগন্তের প্রান্তে, বঙ্গোপসাগরের বুকে ভেসে থাকা এক রূপকথার ভূখণ্ড— সেন্টমার্টিন। এ যেন প্রকৃতির মায়াবী তুলিতে আঁকা জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে নীল আকাশ মিশেছে নীল জলের সঙ্গে, আর প্রবালের শরীরে লেখা আছে হাজার বছরের ভূগোল ও জীবনের ইতিহাস।
এটি শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা— একটি ইকো-সিস্টেম। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও সাগর যেখানে একে অপরের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বীপ ঘিরে যে বিতর্ক, তা শুধু পরিবেশ বনাম পর্যটনের সংঘাত নয়—এটি এক জটিল দার্শনিক প্রশ্ন : মানুষ কি প্রকৃতির রক্ষক, না ভোক্তা?
সেন্টমার্টিন দ্বীপ—বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ—বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর মোহনায় জেগে উঠেছে শত শত বছর আগে। দ্বীপটির আকার ছোট হলেও, এর ভেতর ধারণ করে আছে বিস্ময়কর জীববৈচিত্র্য। সামুদ্রিক প্রবাল, কচ্ছপ, পরিযায়ী পাখি, শৈবাল ও নানা প্রজাতির মাছ—সব মিলিয়ে এটি এক জীবন্ত জাদুঘর। এই দ্বীপে আজও প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বসতি, যাদের জীবন ও জীবিকা প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, আর শীতকালীন পর্যটন—এই তিনেই টিকে আছে দ্বীপের অর্থনীতি। তাদের জীবনের ছন্দ চলে জোয়ার-ভাটার তালে, আর তাদের হাসি-কান্না নির্ভর করে পর্যটন মৌসুমের উপর।
সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য চোখে দেখলে শেষ হয়ে যায় না, এটি হৃদয় দিয়ে অনুভবের বিষয়। ছেড়া দ্বীপের স্বচ্ছ পানিতে তাকালে মনে হয় জলের আয়নায় মানুষ নিজের অস্তিত্ব দেখতে পায়। সূর্যোদয়ের নরম আলো কিংবা সূর্যাস্তের রক্তিম ছায়া—এই দৃশ্যের মধ্যে আছে এক ধরনের নিরাময়শক্তি। শহুরে ক্লান্ত মানুষেরা যখন এই দ্বীপে আসে তারা কি শুধু ভ্রমণে আসে? তারা আসে মানসিক বিকাশের জন্য, আসে অন্তরের পুনর্জন্ম লাভ করার জন্য। এ দ্বীপের পাখিরা যখন আকাশে ডানা মেলে, শিশুরা যখন সমুদ্র চরে দৌড়াদৌড়ি করে তখন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কটি অর্থনৈতিক নয়, এটি অস্তিত্বের সম্পর্ক।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ও রাত্রিযাপন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যে বিতর্ক জেগেছে, পরিবেশ রক্ষার নামে কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা দ্বীপবাসীর জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, পর্যটকদের অবাধ প্রবেশ প্রবাল ও জীববৈচিত্রের ক্ষতি করছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যখন প্রকৃতি ও মানুষ একে অপরের উপর নির্ভরশীল, তখন একপক্ষকে বাদ দিয়ে অন্যকে রক্ষা করা কি সত্যিই সম্ভব? দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের উপযোগবাদী নীতি এখানে প্রাসঙ্গিক—যে সিদ্ধান্ত অধিক সংখ্যক মানুষের সর্বাধিক মঙ্গল বয়ে আনে, সেটিই ন্যায়সঙ্গত। যদি পরিবেশ রক্ষার নামে হাজারো মানুষের জীবিকা বন্ধ হয়ে যায়, শিশুদের শিক্ষা থমকে যায়, সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যায়—তবে কি তা সত্যিই ‘মঙ্গলকর’ সিদ্ধান্ত?
পরিবেশ সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু সংরক্ষণ মানেই ‘বর্জন’ নয়। যুক্তি বলে—‘সীমিত ভোগই টেকসই সংরক্ষণ।’ অর্থাৎ, যদি পর্যটন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে পরিবেশও টিকবে, জীবিকাও চলবে। সে জন্য আমাদের আগে করণীয় হলো : ১. ‘দ্বীপে টেকসই পর্যটন নীতি’ প্রণয়ন করা দরকার, যেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক প্রবেশ করবে, এবং তাদের জন্য পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। ২. ‘বহুতল ভবন নির্মাণ ও বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা’ জোরদার করতে হবে। ৩. স্থানীয় জনগণকে পরিবেশের অংশীদার করে ‘সচেতনতা সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কর্মসূচি’ হাতে নিতে হবে। ৪. পর্যটন মৌসুমে সরকারের পরিবেশ মনিটরিং টিম নিয়োগ করা যেতে পারে, যাতে অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ও দূষণ রোধ হয়। এই পথেই মিলবে ‘মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের সেতু।’
যারা বলেন ‘দ্বীপ রক্ষা করতে হলে পর্যটক আটকাতে হবে’—তারা কি ভেবে দেখেছেন, দ্বীপবাসীর জীবনের বাস্তবতা কী? তাদের আয়ের একমাত্র ভরসা পর্যটন মৌসুম। উদাহরণ স্বরূপ যদি নভেম্বরে পর্যটক নিষিদ্ধ হয়, তবে ডিসেম্বরের অপেক্ষায় পরিবারগুলো কিভাবে বাঁচবে? শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ বন্ধ হবে, কিশোরীরা বাল্যবিবাহে ঝুঁকবে, তরুণরা বেকার হবে, অপরাধ বাড়বে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে পরিবেশ রক্ষার নামের এই সিদ্ধান্ত এক প্রকার ‘গণবিরোধী নিষ্ঠুরতা’। এখানে ‘অ্যারিস্টটলের ‘গোল্ডেন মিন’ দর্শন স্মরণযোগ্য—চরম দুই অবস্থার মাঝেই ন্যায্যতা। অর্থাৎ, একদিকে সম্পূর্ণ মুক্ত পর্যটন নয়, অন্যদিকে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞাও নয়; বরং মধ্যপন্থা—সচেতনতা, নিয়ন্ত্রণ ও সহযোগিতার ভারসাম্য। নীতি মানে কেবল আইন নয়, এটি ‘নৈতিক দায়িত্ব’। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবিকা রক্ষায় ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র প্রকৃতি রক্ষাতেও সফল হতে পারে না।
সেন্টমার্টিনের মানুষেরা প্রকৃতির সন্তান। তারা জানে কীভাবে সমুদ্রের সঙ্গে বাঁচতে হয়, কিভাবে প্রবালের পাশে নৌকা ভিড়াতে হয় যাতে ক্ষতি না হয়। তাদের বাদ দিয়ে পরিবেশ রক্ষা মানে প্রকৃতিকে তারই ভাষা থেকে বঞ্চিত করা। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব—‘দ্বীপের মানুষকে শত্রু নয়, সহযোগী হিসেবে দেখা’। তাদের প্রশিক্ষণ, বিকল্প আয়ের উৎস, ও সচেতনতার মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্ভব।
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের নয়নাভিরাম রত্ন। তাকে রক্ষা করতে হবে—কিন্তু তা হবে ‘প্রেমের মাধ্যমে, নয় নিষেধের মাধ্যমে’। দার্শনিকরা বলে থাকেন, ‘প্রকৃতিকে জয় নয়, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেই মানুষের জয়।’ সেন্টমার্টিনের ভবিষ্যৎও এই সত্যের উপর নির্ভরশীল। রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ নয়, বরং অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও অজ্ঞতার অন্ধকারই প্রকৃত বিপদ। তাই প্রয়োজন মানবিক যুক্তি, নৈতিক সাহস ও টেকসই পরিকল্পনা—যা একসঙ্গে রক্ষা করবে মানুষ ও প্রকৃতিকে। সেন্টমার্টিনের নীল জলে যেন চিরকাল প্রতিফলিত হয় মানুষের বিবেকের স্বচ্ছতা—এটাই আজকের আহ্বান।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও প্রকাশক
পতাকানিউজ/এআই

