ভূমিধস জয় পেয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংসদ নেতাও হচ্ছেন তিনি। মন্ত্রিসভার আকার কেমন হবে? তা নিয়ে সারাদেশে জল্পনা চলছে।
প্রবীণ-নবীনের সমন্বয় থাকছে মন্ত্রিসভায়। আকারেও থাকছে মাঝারি ধরনের। হাফ সেঞ্চুরি পার নাও করতে পারে মন্ত্রীদের সংখ্যা। কিন্তু প্রবীণ-নবীন কিংবা সংখ্যার চেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, নতুন এই মন্ত্রিসভা ২০০১ সালের চেয়েও শক্তিশালী বার্তা দেবে? ওই সময়ের জোট সরকারের বেশ কিছু মন্ত্রণালয় সমালোচনায় পড়েছিল। এবার কি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা ও শক্তিশালী বার্তা দেবেন তারেক রহমান? -সেটি এখন দেশবাসীর দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি এই সরকার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখাতে কতটুকু সক্ষম হবে? সেদিকেও নজর থাকছে দেশবাসীর।
২০০১ সালে বিএনপির মন্ত্রিসভার আয়তন ছিল মেগা সাইজের। ওই সময় দলটির জোটসঙ্গী ছিল আমেরিকার বিরোধী দলের ভূমিকায় যাওয়া জামায়াতে ইসলামীও। ওই সময়ের জোট সরকারের বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতায় দায় পড়েছিল সরকার ও দলের ওপর। ফলে পরবর্তী প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছে বিএনপিকে।
এখন প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই মন্ত্রিসভার সদস্য বাছাই করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও রোববার দলের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেই বিষয়ে নেতাদের কেউ পরিচয় প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে ধারণা পাওয়া গেছে—মন্ত্রিসংখ্যা হবে ৪০ জনের কম। প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীর সংখ্যা হতে পারে ১০ জনের মতো। সব মিলিয়ে ৫০ জন হতে পারে। আবারও দুই-একজন কমও হতে পারে। কিন্তু ৫০-এর বেশি হবে না—এমন তথ্য মিলছে।
যদি মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা ৫০ বা কিছুটা কম হয়, তাহলে শুরুতেই দেশবাসীর কাছে তারেক রহমানের বার্তা হবে—অন্তত ২০০১ সালের মতো ৬০ সদস্যের বহর হচ্ছে না। ওই সময় ৬০ সদস্যের বহর নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিল বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকার। এবার সেই সমালোচনার জায়গা তৈরি করতে চাইছেন না তারেক রহমান। সেই ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে দলীয় নেতাদের কথায়।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার সদস্য বাছাইয়ে তারেক রহমানই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এর মধ্যে অতীতে কোন কোন মন্ত্রণালয়ের কী কী ব্যর্থতা ছিল—সেগুলো চিহ্নিত করে আগামী সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে যেন সেসব মন্ত্রণালয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়—সেটি বিবেচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে।
এ ছাড়া দলের কাণ্ডারিদের মধ্যে কয়েকজনকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। তাঁদের মধ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের নাম বিবেচনায় আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এদের মধ্যে দুই-একজন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তারপরও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তাঁদের বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
অতীত থেকে শিক্ষা
২০০১ সালে সরকার গঠনের পর বিএনপি জোট সরকারের কয়েকটি মন্ত্রণালয় গুরুতর সমালোচনার মুখে পড়েছিল। এর মধ্যে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, নৌপরিবহন, যোগাযোগ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছিল সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সমালোচনার মুখে ছিল চট্টগ্রামে সিইউএফএল জেটিঘাট থেকে ১০ ট্রাক অস্ত্র খালাসের ঘটনা, যে ঘটনায় সাবেক মন্ত্রীসহ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের পরবর্তীতে আদালত ফাঁসির রায় দিয়েছিল। সেই ফাঁসির রায় থেকে পরবর্তীতে মুক্ত হয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এখন বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি হয়েছিলেন তারেক রহমান নিজেই। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে দেশে জঙ্গিবাদের চড়া উত্থানের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার তখন বড় ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছিল। রাজশাহী অঞ্চলে বাংলা ভাইয়ের উত্থানও হয়েছিল বিএনপি সরকারের আমলে।
এ ছাড়া বিএনপি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন গঠন করেছিল। পরবর্তীতে সেই বাহিনীর বিরুদ্ধেই মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে এবং বর্তমানে বাহিনী বিলুপ্তির দাবি প্রবল।
বিশ্লেষকদের মন্তব্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক রহমান নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য বাছাইয়ের আগে অবশ্যই এসব বিবেচনায় নেবেন এবং আগামীর সরকার পরিচালনার পথ যেন আরও বেশি মসৃণ হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকবেন। কারণ, তারেক রহমান নিজেই নিপীড়িত। নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল। পুনরায় দেশে ফিরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন—একটা সময় এমন স্বপ্নও হয়তো তিনি দেখেননি।
বর্তমানে দেশের অবস্থা পাল্টেছে। তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি অধিকার-সচেতন। টানা আন্দোলন করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে প্রবল ক্ষমতাশালী শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত করেছে। এখন তরুণ প্রজন্মই দেশের পাহারাদারের ভূমিকায় আছে। যে কোনো অনিয়ম দেখলেই তারা প্রতিবাদ করবে—এমন লড়াকু মানসিকতা তরুণ প্রজন্মের আছে।
নতুন বার্তা
আন্দোলনের তীব্রতা এবং ভবিষ্যতে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে তারেক রহমান ওয়াকিবহাল। তাই এসব বিষয় মাথায় রেখে দুর্নীতিমুক্ত ও বলিষ্ঠভাবে সরকার পরিচালনার ইচ্ছাপোষণ করেন তিনি। সেই কারণেই এবারের মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে শুরুতেই একটি ইতিবাচক বার্তা দেশবাসীকে দেবেন—এটাই মনে করছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
নেতাদের কথার সত্যতা পাওয়া যায় তারেক রহমানের বক্তব্যে। নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিশোধের রাজনীতি বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এ ছাড়া সম্প্রীতির রাজনীতির বিষয়েও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রোববার সন্ধ্যায় তিনি আগামী সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা তথা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং তরুণদের দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের আগেই বিরোধীদলীয় নেতার বাসায় যাওয়া এবং দেশ পরিচালনায় সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়গুলোকে বেশ ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি সামাল দিতে পারবেন?
আগামী সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারকে। এখন সেনাবাহিনী মাঠে আছে। কয়েকদিন পর হয়তো সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরবে। ইতোমধ্যেই সেনাপ্রধান সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সেনাবাহিনী মাঠে আছে। এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে এসে সেনাসদস্যরা ব্যারাকে ফিরবে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভঙ্গুর পুলিশ বাহিনী কতটা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবে—সেটা এখনো চ্যালেঞ্জিং। কারণ, ২০২৪ সালের আন্দোলনে বাহিনীগতভাবে পুলিশ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহিনীটি এখনো যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারকে সর্বাত্মক মনোযোগী হতে হবে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
এ ছাড়া অর্থনীতির অবস্থা এখন বেশ নাজুক। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে অর্থনীতির করুণ পরিণতি হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সময়ে বেশ খানিকটা অগ্রগতি হলেও স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখনো হয়নি। ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ যাচ্ছে। অর্থ-বাণিজ্য-শিল্প স্বাভাবিক করতে না পারলে দেশের মানুষ দ্রুতই সরকারের ওপর বিগড়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, দেশের মানুষ এখন কঠিন অর্থনৈতিক সময় পার করছে। অনেকগুলো ব্যাংকের অবস্থা নাজুক।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান মত দিয়েছেন, নতুন সরকারকে শুরুতেই অর্থনৈতিক খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের কর্মদক্ষতা কেমন হবে—তা বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের কাছে বড় বার্তা দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালে সরকার পরিচালনার দুর্বলতা এড়িয়ে নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপেই সু-বার্তা দেবেন তারেক রহমান। এটাই এখন প্রত্যাশিত।
—পতাকানিউজ

