আজ নতুন বর্ষ শুরু। নতুন দিনের শুরু। পুরনো দিনের স্মৃতি বাদ দিয়ে আজ থেকে নবপথ চলা বাঙালির। এমন পথচলায় সবার জন্যই শুভ কামনা।
কিন্তু। এই কিন্তুটি কি? সেটাই হতাশার জায়গা তৈরি করেছে এবার। হতাশা দেশ কিংবা বাঙালি সমাজ নিয়ে নয়। হতাশা যুদ্ধবাজ দেশের কুকর্ম নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবাজ দেশ জ্বলন্ত উনুন বানিয়েছে। সেই উনুনের তাপ যে বাঙালির আনন্দ উৎসবেও পড়েছে!
এই যে তেল সংকট, পাম্পের দীর্ঘ সারিবদ্ধ গাড়ির অপেক্ষা। প্রবাসীর মৃত্যু কিংবা প্রবাসী সংকট-সবই তো যুদ্ধবাজদের কুর্মের ফল। যা ভোগ করতে হচ্ছে বাঙালি সমাজকেও।
তারপরও সেই কুকর্মের কথা সাময়িক ভুলে আজ দিনটি শুধুই বাঙালিপণার। আজ আনন্দের দিন। উল্লাসের দিন। সুখের দিন। তাই পুরনো কিংবা যুদ্ধবাজদের কুকর্ম ভুলে আজ বাঙালি মিলছে প্রাণের মেলায়। প্রাণের বন্ধনই যে প্রকৃত বন্ধন।
আজ প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। দুঃখ-দারিদ্র্য, হতাশা আর ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে নতুন বছরের প্রথম দিনে বাঙালি যেন আবারও খুঁজে নিচ্ছে নিজের শেকড়, নিজের সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয়ের শক্ত ভিত।
আজ মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের যাত্রা। কেবল একটি নতুন বছর নয়, এটি বাঙালির জীবনে নতুন শক্তি, নতুন আশা আর নতুন শপথের দিন। পুরনো বছরের ব্যর্থতা, গ্লানি আর অপ্রাপ্তিকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এক ধরনের মানসিক পুনর্জাগরণ ঘটে বাঙালির জীবনে। শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই তাই আজ উৎসবের আমেজ।
বাংলা নববর্ষ কেবল পঞ্জিকার পাতা উল্টানোর বিষয় নয়; এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং আত্মপরিচয়ের প্রকৃত প্রতীক। হাজার বছরের ঐতিহ্য, কৃষিভিত্তিক জীবনধারা এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এই দিনটিই বাঙালির সর্বজনীন উৎসব।
রাজধানী ঢাকা কিংবা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় চলছে বর্ণাঢ্য আয়োজন। রঙিন পোশাক, লোকজ সংগীত, মেলা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস-সব মিলিয়ে দিনভর এক উৎসবমুখর পরিবেশে মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ। শহরের ব্যস্ততা যেন আজ ‘ছুটি’ নিয়েছে। ব্যস্ততা আজ রূপ নিয়েছে উৎসবের আনন্দ দিনে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
এই দিনে দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পৃথক বাণীতে দেশবাসী ও বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রতি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও নববর্ষ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দেশবাসী ও প্রবাসীদের।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে পহেলা বৈশাখকে ঐক্য, সম্প্রীতি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নতুন বছরে পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সংযম, দায়িত্বশীলতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নববর্ষকে জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে বাংলা নববর্ষের সম্পর্ক গভীর। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে। একই সঙ্গে তিনি শান্তি, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

প্রাণের মেলা
নববর্ষের মূল আকর্ষণগুলোর একটি হলো রমনার ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীর রমনা উদ্যানের চারপাশে জমে ওঠে মানুষের ঢল। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ছায়ানটের পরিবেশনা, যেখানে সংগীত, কবিতা ও আবৃত্তির মাধ্যমে বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়। প্রায় দুই শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে সাজানো এই আয়োজন প্রকৃতি, মানবতা, দেশপ্রেম এবং লোকজ জীবনের সুরে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হচ্ছে গণসংগীতের অগ্রণী শিল্পী ও সুরকারদের, যারা বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের স্মরণে পরিবেশনায় যোগ হয়েছে বিশেষ আবেগ ও শ্রদ্ধা।
সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু বহুল প্রতীক্ষিত বৈশাখী শোভাযাত্রা। সময়ের পরিবর্তন ও বিতর্ক এড়াতে এবারের শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নাম পরিবর্তন হলেও শোভাযাত্রার প্রাণবন্ততা, রঙ ও প্রতীকী অর্থে কোনো ঘাটতি নেই।

চারুকলা অনুষদের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি শাহবাগ, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর ঘুরে আবার চারুকলায় ফিরে আসে। এবারের শোভাযাত্রার স্লোগান- নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান।
শোভাযাত্রায় স্থান পেয়েছে পাঁচটি প্রধান প্রতীক-মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। লোকজ সংস্কৃতিতে এসব প্রতীক নতুন দিন, সৃজনশীলতা, শান্তি, শক্তি, গৌরব ও গতিশীলতার প্রতিনিধিত্ব করে। প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করে অংশ নেন এই শোভাযাত্রায়, যা সামষ্টিক চেতনার এক শক্তিশালী প্রকাশ।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও নববর্ষকে ঘিরে নানা আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ৫ দিনের বৈশাখী উৎসবের আয়োজন করেছে, যেখানে রয়েছে কবিগান, গম্ভীরা, বাউল গান, নাট্য পরিবেশনা, অ্যাক্রোব্যাটিক প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শন।
ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ উদ্যোগ ‘হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ’। ভোর থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীরা অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি চলছে বৈশাখী মেলা, যেখানে গ্রামীণ হস্তশিল্প, মাটির তৈরি সামগ্রী, খেলনা এবং লোকজ সংস্কৃতির নানা উপকরণ স্থান পেয়েছে।
দেশজুড়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজন শুধু বিনোদনের জন্য নয়; বরং নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
অতীতে পহেলা বৈশাখ মূলত কৃষিভিত্তিক একটি সামাজিক অনুষ্ঠান। হালখাতা খোলা, পুরনো হিসাব মিটিয়ে নতুন হিসাব শুরু করা, মিষ্টিমুখ এবং সামাজিক সম্পর্ক নবায়নের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ জীবনে এক বিশেষ বন্ধনের সৃষ্টি হতো। সময়ের পরিবর্তনে সেই রূপ কিছুটা বদলালেও এখনো দেশের বিভিন্ন বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হালখাতার ঐতিহ্য টিকে আছে।
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস দীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক। মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে কৃষিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে সহজ করতে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। পরবর্তীতে এটি বঙ্গাব্দ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
পাকিস্তান শাসনামলে বাংলা নববর্ষ হয়ে ওঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের রমনা বটমূলে প্রভাতী অনুষ্ঠান ছিল সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অন্যতম প্রকাশ। পরে ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের শোভাযাত্রা শুরু হলে তা অসাম্প্রদায়িক চেতনার শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
২০১৬ সালে ইউনেসকো এই শোভাযাত্রাকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি শুধু একটি উৎসবকে নয়, বরং বাঙালির সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও ঐক্যকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সব মিলিয়ে, বৈশাখ এখন শুধু একটি উৎসব নয়-এটি বাঙালির অস্তিত্ব, চেতনা এবং আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত প্রকাশ। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির অস্থিরতার মধ্যেও এই উৎসব মানুষকে মনে করিয়ে দেয়-সংস্কৃতি, ঐক্য আর মানবিকতা কখনো হারিয়ে যায় না, বরং নতুন করে ফিরে আসে আরও শক্তি নিয়ে।
-পতাকানিউজ

