ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে যখন প্রচারণার জোরালো তৎপরতা চলছে, তখন মানিকগঞ্জের দুর্গম চরাঞ্চলে এখনো তেমন নির্বাচনী উত্তাপ তৈরি হয়নি। পদ্মা ও যমুনা নদীবেষ্টিত এসব চর এলাকায় সীমিত প্রচারণার কারণে ভোটারদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে নির্লিপ্ত ভাব।
মানিকগঞ্জ জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুটি আসনের মোট ১০৩টি ভোটকেন্দ্র দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত। এসব এলাকায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ট্রলার ও নৌযান। সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক প্রার্থী নিয়মিতভাবে চরাঞ্চলে পৌঁছাতে পারছেন না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
হরিরামপুর, শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার চর এলাকায় যেতে দীর্ঘ সময় লাগে। সংশ্লিষ্ট দুই আসনে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও অনেক চরগ্রামে তাঁদের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থী ও তাঁদের নেতাকর্মীরা মাঝেমধ্যে উঠান বৈঠক ও লিফলেট বিতরণ করলেও অধিকাংশ চরেই এখনো ভোটের আমেজ দেখা যাচ্ছে না।
আসনভিত্তিক তথ্যে জানা যায়, মানিকগঞ্জ–১ আসনটি শিবালয়, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে শিবালয় উপজেলার চারটি এবং দৌলতপুর উপজেলার ৩৪টি ভোটকেন্দ্র দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থিত। অন্যদিকে মানিকগঞ্জ–২ আসনটি সিংগাইর, হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনের হরিরামপুর উপজেলার ৬৫টি ভোটকেন্দ্রই দুর্গম চরাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত।
হরিরামপুর উপজেলার সেলিমপুর এলাকার বাসিন্দা আলামীন হোসেন বলেন, নির্বাচন সামনে থাকলেও চরাঞ্চলে এখনো উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়নি। তাঁর ভাষ্য, দু-একজন প্রার্থী এলেও নিয়মিত প্রচারণা বা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ চোখে পড়ছে না। অনেক প্রার্থী এখনো এলাকায় পা রাখেননি, ফলে ভোটারদের আগ্রহও কম।
দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া এলাকার বাসিন্দা নান্নু মিয়া বলেন, সাধারণত নির্বাচন এলেই চরজুড়ে আলাদা একটি আবহ তৈরি হয়। কিন্তু এবার তা দেখা যাচ্ছে না। যাতায়াতের দুর্ভোগের কারণে অনেক প্রার্থী চর এলাকায় আসছেন না বলে তিনি মনে করেন, যার প্রভাব ভোটারদের মনোভাবেও পড়ছে।
মানিকগঞ্জ–১ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবির বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বছরজুড়েই দলীয় ও মানবিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে তিনি চর এলাকায় যাতায়াত করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ এবং সরাসরি ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনার কথাও জানান তিনি। তাঁর দাবি, নেতাকর্মীরাও নিয়মিতভাবে বিভিন্ন চর এলাকায় যোগাযোগ রাখছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ইন্তাজ উদ্দিন বলেন, দুর্গম চরাঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণা কম হওয়া উদ্বেগজনক। এসব এলাকার ভোটারদের গুরুত্ব অন্য এলাকার মতোই সমান। প্রার্থীরা সরাসরি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা না বললে অংশগ্রহণমূলক ও অর্থবহ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, চরাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে যাতায়াত, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাহিয়ান নুরেন জানান, চর এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নৌযান ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার বলেন, উপজেলার সব ভোটকেন্দ্রই দুর্গম চরাঞ্চলে হওয়ায় আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
-পতাকানিউ/জিএইচসি

