আমরা সবাই জানি—ফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কাজ, খবর, বিনোদন—সবকিছুই এখন স্মার্টফোনের এক চাপে পাওয়া যায়। তবু একটা অস্বস্তিকর সত্য রয়ে যায়—ফোন যত কাছে আসছে, মানুষ যেন মানুষের কাছেই একটু দূরে সরে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সামাজিক আচরণে যুক্ত হয়েছে নতুন এক শব্দ—‘ফাবিং’। অর্থাৎ, ফোনে ডুবে গিয়ে সামনে থাকা মানুষটিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা। শুনতে সামান্য মনে হলেও, গবেষকদের মতে এই অভ্যাস ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভেতর এক গভীর ফাটল তৈরি করতে পারে।
সামান্য উপেক্ষাই বড় দূরত্ব তৈরি করে
একটু মেসেজ চেক করা, নোটিফিকেশন দেখে নেওয়া, কিংবা ‘একটা কথা গুগলে দেখতে হবে’—এই ছোট সিদ্ধান্তগুলিই অনেক সময় সঙ্গীদের মনে উপেক্ষিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি করে। তারা ভাবে, ‘আমার চেয়ে ফোনই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?’
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সম্পর্কের নিরাপদ বন্ধন তখনই দুর্বল হয়ে যায়, যখন একজন মনে করে তার গুরুত্ব অন্য কারও বা অন্য কিছুর তুলনায় কমে গেছে।
গবেষণায় ধরা পড়েছে কী?
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ক্লেয়ার হার্ট ১৯৬ জন মানুষের ওপর একটি গবেষণা চালান। সেখানে দেখা যায়— কেউ যত বেশি ফাবিংয়ের শিকার মনে করেন,→ তাদের সম্পর্কের গুণগত মান ততটাই কমে যায়।
উপেক্ষিত হওয়ার অনুভূতি→ অনেককে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নিজের ফোনের দিকে ঠেলে দেয়।
এতে তৈরি হয়→ দুজনের মধ্যেই নীরব দূরত্বের চক্র।

ড. হার্ট বলেন, ‘একজন ফোনে ডুবে গেলে, অপরজনও নিজের ফোন তুলে নেয়। তখন দু’জনেই মনে করে তারা কম গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই শুরু হয় সমস্যার ঘূর্ণি।’ যখন আপনি দু’জনে ভাগ করে নেয়া কোনো মুহূর্ত ত্যাগ করে স্ক্রিনে মন দেন, তখন আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। সম্পর্কের উষ্ণতা তখন কিছুটা হলেও নরম হয়ে আসে।
দুই প্রজন্মেই প্রভাব
ফাবিং শুধু দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গভীর।
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার→ সম্পর্কের বন্ধনকে দুর্বল করে।
বড়দের ক্ষেত্রে→ আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে, তারা মনে করে ‘আমি কি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নই?’
একটি পরিবারের নীরবতা কখন যে ফেলে—মাঝে মাঝে আমরা বুঝতেই পারি না।
বিশেষজ্ঞের সহজ পরামর্শ : বদলে ফেলুন মাত্র একটি অভ্যাস
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাইটলিন রেজিয়ারের মতে, নিজেকে দোষারোপ না করে একটি ছোট সিদ্ধান্তই সবকিছু বদলে দিতে পারে।
তিনি বলেন—‘ফোন তুললে যার সঙ্গে আছেন তাকে জানিয়ে দিন কেন তুলছেন।’
এভাবে বললে সম্পর্কের প্রতি সম্মান প্রকাশ পায়:
‘ট্রেনের সময়টা দেখে নিচ্ছি।’
‘একটা জরুরি মেসেজ এসেছে, রিপ্লাই করে দিচ্ছি।’
‘এটা শেষ হলেই আপনার দিকেই পুরো মনোযোগ।’
এই স্বচ্ছতা দুটি কাজ করে—
আপনার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোনে ডুবে যাওয়ার প্রবণতা থামায়।
সঙ্গীকে নিশ্চিত করে—সে এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
ড. রেজিয়ার বলেন— ‘এতে মানুষ উপেক্ষিত বোধ করে না, আর আপনি নিজেও অসচেতনভাবে স্ক্রলিংয়ে হারিয়ে যান না।’

কীভাবে শুরু করবেন?
পারিবারিক খাবারের সময়→ ফোনটিকে দূরে রাখুন।
বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সময়→ নোটিফিকেশন থেকে বিরতি নিন।
বিশেষ মুহূর্তে→ ‘ফোন-ফ্রি জোন’ তৈরি করুন।
এগুলো ছোট সিদ্ধান্ত, কিন্তু সম্পর্কের জন্য এর প্রভাব অনেক গভীর।
শেষ কথা
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু স্ক্রিনের আলোয় আমাদের অনেক সুন্দর মুহূর্ত ঢেকে যাচ্ছে। ফোন আমাদের দরকার—তবে সম্পর্কই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
তাই আজ থেকেই শুরু করা যায়— একটি ছোট পরিবর্তন। একটি ছোট সচেতনতা। এবং সামান্যতম সম্মানের প্রকাশ। এতেই বদলে যেতে পারে সম্পর্কের সম্পূর্ণ ছবি।
সূত্র : বিবিসি
পতাকানিউজ/কেএস

