আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ (সদর) ও বগুড়া-৭ (গাবতলী- শাজাহানপুর) আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচন করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বগুড়া-৭ আসন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এই দুটি আসন বগুড়ার ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। তাই এই দুই আসনে মা-ছেলের প্রতিদ্বন্দ্বী কারা হচ্ছেন-এ নিয়ে চলছে গুঞ্জন। ইতিমধ্যে আরও চারটি দল তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। দলগুলো হলো জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, ও গণতন্ত্র মঞ্চ।
এদিকে, বিগত দিনেও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই দুই আসন থেকে নির্বাচন করে আসছেন। এজন্য সারাদেশের মানুষের নজর এ দুই আসন ঘিরে। তবে এবার বাড়তি নজর থাকবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে। তিনি প্রার্থী হওয়ায় খুশি দলের নেতাকর্মীর।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৫ এপ্রিল জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে শহর জামায়াতের আমীর ও সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল এবং বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেড়ারেশনের সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানীর নাম রয়েছে। সেই হিসেবে বগুড়া-৬ আসনে তারেক রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন শহর জামায়াতের আমীর ও সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল।
জামায়াতের সোহেল ছাড়াও অন্যান্য দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন- ইসলামী আন্দোলনের বগুড়া জেলা সভাপতি আ.ন.ম মামুনুর রশীদ, বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির নেতা আবদুর রউফ, বাসদের অ্যাডভোকেট দিলরুবা নুর। এ পর্যন্ত ৫টি দল তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে।
একইভাবে বগুড়া-৭ আসনে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন জামায়াতের বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী, ইসলামী আন্দোলনের অধ্যাপক সবুজ ইসলাম সফিক, বাসদের শহিদুল ইসলাম এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) নেতা মনিরুজ্জামান বাচ্চু।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া-৬ আসনে ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলেও এ আসনে উপনির্বাচনসহ ১৬ বার নির্বাচন হয়েছে। এ আসন থেকে খালেদা জিয়ার তিনবারসহ বিএনপি প্রার্থী ১০ বার নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের প্রার্থী তিনবার, জাতীয় পার্টি একবার, জামায়াতে ইসলামী একবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার নির্বাচিত হয়েছেন।
১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের এসএম সিরাজুল ইসলাম সুরজ এবং ১৯৭৯ সালে বিএনপির ওয়াজেদ হোসেন তরফদার নির্বাচিত হন। সীমানা পরিবর্তনের পর ১৯৮৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর আবদুর রহমান ফকির নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুর রহমান ভান্ডারী নির্বাচিত হন। এরপর আসনটি বিএনপির দখলে চলে যায়।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে মজিবর রহমান, ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়া ও উপনির্বাচনে অ্যাডভোকেট জহুরুল ইসলাম, ২০০১ ও ২০০৮ সালে খালেদা জিয়া নির্বাচিত হন। উপ-নির্বাচনে বিএনপি থেকে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম ওমর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হলেও শপথ না নেয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। উপ-নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের উপ-নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের রাগেবুল আহসান রিপু পুনরায় নির্বাচিত হন।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া সদর থেকে নির্বাচন করবেন এটা আমাদের অত্যন্ত গর্বের বিষয়। জীবনের প্রথম তিনি প্রার্থী হচ্ছেন এটা কত বড় আনন্দের তা বলে বোঝানো যাবে না। বগুড়ার নেতাকর্মীরা উৎসবমুখর পরিবেশে তারেক রহমানের ভোট করবেন।’
জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল বলেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্যই হলো নির্বাচন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই। জনগণ যাকে ভাল মনে করবেন তাকেই বেছে নিবেন। তা নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।’
এদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দায়িত্বশীল নেতারা নির্বাচন করে থাকেন। তাই এ আসনটিকেও ভিভিআইপি আসন বলা হয়। যদিও খালেদা জিয়া সংসদে এ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেননি। প্রতিবার উপ-নির্বাচন হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ১৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপ-নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ১০ বার, আওয়ামী লীগ দুবার, জাতীয় পার্টি দুবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার নির্বাচিত হন।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে উপ-নির্বাচনের কারণে ১৫ বার নির্বাচন হয়েছে। এ আসন থেকে খালেদা জিয়া পাঁচবারসহ বিএনপি প্রার্থী ১০ বার নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আমানউল্লাহ খান ও ১৯৭৯ সালে বিএনপির হাবিবুর রহমান এমপি নির্বাচিত হন। সীমানা পরিবর্তনের পর ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির আমিনুল ইসলাম সরকার পিন্টু নির্বাচিত হন। এরপর আসনটি বিএনপির হাতে চলে যায়।
২০০৯ সাল পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থীরা এ আসনে বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির খালেদা জিয়া নির্বাচিত হন। তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে ওই বছরের সেপ্টেম্বরের উপ-নির্বাচনে তার উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু এমপি হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও ১৯৯৬ সালের জুনের দুটি নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। তিনি আসন ছেড়ে দিলে ১৯৯৬ সালের উপ-নির্বাচনে আবারও তার আস্থাভাজন হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু নির্বাচিত হন।
২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে খালেদা জিয়া নির্বাচিত হন। তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে ২০০১ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে লালু পুনরায় এমপি হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া এমপি হন। তিনি আবারও আসনটি ছেড়ে দিলে ২০০৯ সালের উপ-নির্বাচনে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এরপর বিএনপি ও জামায়াত জোট নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের শরিক জাতীয় পার্টিকে বগুড়া-৭ আসনটি উপহার দেয়। নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) মুহাম্মদ আলতাফ আলী এমপি নির্বাচিত হন।
পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোটে বহুল আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম বাবলু এমপি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডা. মোস্তফা আলম নান্নুকে প্রার্থী করা হয়। তিনি বিপুল ভোটে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন।
জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টন বলেন, ‘আমাদের সবার চাওয়া ছিল বেগম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান এই আসনে প্রার্থী হোক। অবশেষে তাই হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া প্রার্থী হয়েছেন। আমরা সবাই একযোগে ভোট করবো।’
বগুড়া-৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী গোলাম রব্বানী বলেন, ‘বিএনপি যাকে ভাল মনে করেছেন তাকেই প্রার্থী দিয়েছেন। তারাই ফয়সালা করেছেন। এতে আমরা কিছু মনে করি না। গণতন্ত্রের স্বার্থেই আমরা ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। তবে ভোটের মাঠ যথেষ্ট সাড়া পাচ্ছি।’
পতাকানিউজ/পিএম/আরবি

