গত শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাব পড়ার পর রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় শনিবার (২২ নভেম্বর) আরও তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। মাত্র ৩২ ঘণ্টার ব্যবধানে এই চারটি কম্পনকে ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা ‘আফটার শক’ হিসেবে দেখছেন, যা বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে পারে।
শনিবারের তিনটি কম্পনের মধ্যে একটি নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ৩.৩ মাত্রার, আর বাকি দুটি ঢাকার বাড্ডায় যথাক্রমে ৩.৭ এবং ৪.৩ মাত্রার রিখটার স্কেলে মাপা গেছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বড় ভূমিকম্প সাধারণত সেই এলাকায় হয় যেখানে ভূ-অভ্যন্তরে শক্তি ঘনীভূত থাকে, অর্থাৎ সাবডাকশন জোনে। ঢাকার অবস্থান এই ধরনের জোনের নিকটে হওয়ায় ঝুঁকি অনেকাংশে বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তর তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে। পূর্বদিকে বার্মিজ সাবপ্লেটের নিচে ইন্ডিয়ান প্লেট তলিয়ে যাচ্ছে, উত্তর-পশ্চিমে ইউরেশিয়ান প্লেটে ইন্ডিয়ান প্লেট তলিয়ে যাচ্ছে, এবং বার্মিজ সাবপ্লেটও ইউরেশিয়ান প্লেটের অংশ। এই ক্রিয়া সাবডাকশন নামে পরিচিত। সাবডাকশন জোনের কাছাকাছি অঞ্চলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ঢাকার আশপাশে মধুপুর, শীতলক্ষ্যা নদী ও ডাউকি ফল্টসহ বহু ফল্ট রয়েছে, যা ভূমিকম্পের প্রমাণ দেয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, এই ধরনের মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের ‘ফোরশক’ হতে পারে। শুক্রবারের কম্পনের পর শনিবার নরসিংদী ও ঢাকায় তিনটি ছোট কম্পন সেই আশঙ্কাকে আরও জোরদার করেছে। আগামী কয়েকদিনে যদি এমন ছোট কম্পন চলতে থাকে, তবে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার উল্লেখ করেন, সাবডাকশন জোন বা ডাউকি ফল্ট থেকে আসা ভূমিকম্প মূলত ঢাকাকে ঝুঁকিতে ফেলে। যদিও বড় ভূমিকম্প শহরের কেন্দ্রস্থলে নাও হতে পারে, ছোট-মাঝারি কম্পনও গুরুতর ক্ষতি করতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে প্রস্তুতি নেওয়া অপরিহার্য। ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা ব্যবহার, বাড়ির সামনে প্রশস্ত রাস্তা রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দ্রুত চিহ্নিতকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অন্যতম জরুরি ব্যবস্থা। সরকারের পক্ষ থেকে সচেতনতা কার্যক্রম, জাতীয় কমিটি গঠন, সভা-সেমিনার আয়োজন এবং সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে জনগণকে প্রস্তুত করার পদক্ষেপ প্রয়োজন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বড় ভূমিকম্প হলে কতজন নিরাপদে থাকতে পারবে, হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কার্যকর থাকবে কি না। এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রস্তুতি ছাড়া মানুষ ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
পতাকানিউজ/এনটি

