সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ আশেপাশের এলাকায় একের পর এক ভূমিকম্পের ঘটনা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত শুক্র ও শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার মধ্যে চারটি ভূমিকম্পে দেশের রাজধানীর বড় ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যা ঘনত্ব এবং নির্মাণ মানের অনিয়ম ঢাকার বিপদ আরও বাড়াচ্ছে।
গত শুক্রবার সকালে ঢাকার নিকটবর্তী নরসিংদীর মাধবদী থেকে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা মাত্র ১০ কিলোমিটার হওয়ায় ঝাঁকুনি তীব্র ছিল। এই ভূমিকম্পে শিশুসহ ১০ জন নিহত এবং ৬ শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তীতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরও তিনটি মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে; এর মধ্যে দুটির উৎস নরসিংদী এবং একটি বাড্ডা থেকে। বিশেষজ্ঞরা এই মৃদু ও মাঝারি কম্পনকে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ভেতরে ৩৯টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টির উৎপত্তিস্থল ঢাকার ৮৬ কিলোমিটারের মধ্যে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলগুলো ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরের বিপদের চারটি মূল কারণ আছে। প্রথমত, উৎপত্তিস্থল থেকে রাজধানীর নৈকট্য। দ্বিতীয়ত, ঢাকার নতুন অংশগুলোর মাটি ভরাটে তৈরি হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, শহরের অনেক ভবন ইমারত নির্মাণ বিধি ও ডিজাইন কোড না মেনে তৈরি হচ্ছে। চতুর্থত, ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ঘনত্ব। এই সব কারণে ক্ষয়ক্ষতি বড় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, গতকালের ভূমিকম্পের শক্তির একটি বড় অংশ সাবডাকশন জোনে সঞ্চিত আছে, যার মাত্র সামান্যই নির্গত হয়েছে। ফলে নতুন কম্পনগুলো ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের পথ খুলেছে। তিনি আফটার শকগুলোর গুরুত্বও দেখিয়ে বলেন, ভূ-অভ্যন্তরের ফল্ট লাইনগুলো এখন নড়ে উঠছে এবং শক্তি মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রস্তুতির দিক থেকে দেখা যায়, ২০১৬ সালে ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার নির্মাণের জন্য চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। তবে গত এক দশকে বাস্তবায়ন হয়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস ব্যবহার করা হবে। ৪৮ হাজার নগর স্বেচ্ছাসেবক এবং ৮০ হাজার উপকূলীয় স্বেচ্ছাসেবককে যুক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে।
তবে দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা মনে করছেন, প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। জেলা পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে দেরি হচ্ছে এবং স্থানীয় সরকারকে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভূমিকম্প সচেতনতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, নতুবা আতঙ্কে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে।
ঢাকার বিপদের রূপ এই ভূমিকম্পে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সময়মতো প্রস্তুতি নিলে বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব, নতুবা ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্প শহরটিকে মারাত্মক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পতাকানিউজ/এনটি

