কখনো ঘরের সিলিংয়ে বিশাল অজগর, কখনো মাছ ধরার জালে আটকে থাকা দাঁড়াশ, আবার কখনো বসতঘরের ভেতর বিষধর শঙ্খিনী। শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় এমন দৃশ্য এখন আর খুব একটা বিরল নয়। বন, চা-বাগান, টিলা ও জলাভূমিতে ঘেরা এই জনপদে মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও যেন বাড়ছে।
গত আগস্ট মাসে শুধু শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে ২০টি বন্যপ্রাণী। এর মধ্যে ১৭টিই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। এ ছাড়া ছিল একটি শঙ্খচিল ও দুটি বানর। উদ্ধার হওয়া সাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল অজগর-৯টি। এর একটি ছিল মৃত।
প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার বন্যপ্রাণীকে লোকালয়ে আসতে হচ্ছে?
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনাঞ্চল ঘিরে মানুষের বসতি, আবাসিক এলাকা, কৃষিকাজ ও বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা বাড়ছে। বনভূমির ভেতরে মানুষের প্রবেশ যেমন বাড়ছে, তেমনি সড়ক ও রেলপথের মতো অবকাঠামোও কেটে গেছে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে। পরিবেশকর্মী ও বন্যপ্রাণী সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটও যুক্ত হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে বিভিন্ন প্রাণী।
তবে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, গরম ও বর্ষার মৌসুমে বন্যপ্রাণীর চলাচল বেড়ে যাওয়াও লোকালয়ে আসার একটি কারণ হতে পারে।
এক মাসে ২০ প্রাণী উদ্ধার
আগস্টের শুরুতেই শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের ধানখেত থেকে অজগর উদ্ধারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মাসব্যাপী এই উদ্ধার কার্যক্রম।
২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি বেত আঁচড়া। ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে উদ্ধার করা হয় একটি মৃত অজগর।
১২ আগস্ট শাহীবাগ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি শঙ্খচিল। পরদিন ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
১৩ আগস্ট উদ্ধার করা অজগরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২ ফুট। ওজন প্রায় ১৬ কেজি। পরে সেটিকে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১৫ আগস্ট ছিল উদ্ধার অভিযানের ব্যস্ততম দিনগুলোর একটি। ওই দিন রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়।
নোয়াগাঁওয়ে মাছ ধরার জালে আটকে পড়েছিল দাঁড়াশটি। স্থানীয়রা সাপটিকে না মেরে খবর দেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে। পরে উদ্ধারকারী দল গিয়ে সেটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় মানুষের এই সচেতনতা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরপর ১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ এবং ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়। ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একটি শঙ্খিনী সাপ। অত্যন্ত বিষধর এই সাপটিকেও নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
মাসের শেষ সপ্তাহেও থামেনি উদ্ধার কার্যক্রম। ২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সাপটির প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।
২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।

বনের ভেতরে খাবারের সংকট
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, বনের ভেতরে খাবারের সংকট এবং বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।
তিনি বলেন, উদ্ধার করা প্রাণীগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিচর্যা দিয়ে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
বন উজাড়ের বিষয়টি উল্লেখ করে স্বপন দেব সজল বলেন, ‘বন উজাড় হচ্ছে, আর খাবার না থাকলে প্রাণী কীভাবে থাকবে? এ বিষয়ে বন বিভাগের আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
হাইল হাওর থেকে অজগর উদ্ধারের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষকেরা প্রথমে সাপটিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় একজন ব্যক্তি বাধা দিয়ে ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল গিয়ে অজগরটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে সাপ দেখলে অনেক ক্ষেত্রেই সেটিকে মেরে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়।
পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেটিকে হত্যা করেন। অথচ এসব প্রাণী প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, ‘বাড়ি বা লোকালয়ে সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল বা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।’
তাঁর মতে, সাপসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীকে হত্যা না করে নিরাপদে উদ্ধার করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।
বন বিভাগের ব্যাখ্যা
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগস্টের শুরুতে উদ্ধার করা অজগরটির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে বনে অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এক মাসে এত বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন গরম ও বর্ষার সময়। এ কারণে হয়তো প্রাণীগুলো লোকালয়ে চলে আসছে। তাছাড়া খাবার ও অন্যান্য কোনো সংকট নেই।’
তবে বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক ও রেলপথ চলে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এতে অনেক প্রাণী আহত বা মারা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তাঁর মতে, সড়কপথের বিন্যাস বা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গেলে প্রাণীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দিন দিন বনে প্রাণী বাড়ছে, কমছে না। আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি প্রাণী দেখা যাচ্ছে।’
মৌসুমি চলাচল, নাকি আবাসস্থলের সংকট?
বন বিভাগের এই বক্তব্যের সঙ্গে অবশ্য একমত নন পরিবেশকর্মীদের একাংশ। তাঁদের মতে, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিকে শুধু মৌসুমি চলাচলের ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না।

শ্রীমঙ্গলের বন, চা-বাগান, টিলা ও জলাভূমি ঘিরে মানুষের বসতি ও অবকাঠামো ক্রমেই বাড়ছে। এসব এলাকায় বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে তারা বিকল্প পথ হিসেবে মানুষের বসতি, কৃষিজমি কিংবা আবাসিক এলাকায় চলে আসতে পারে।
বিশেষ করে সাপের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এলাকার ইঁদুর, ব্যাঙ, মাছসহ খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন উপাদানের অবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থাৎ, লোকালয়ে একটি অজগর কিংবা শঙ্খিনী সাপের উপস্থিতি হয়তো কেবল একটি প্রাণীর পথ ভুলে মানুষের ঘরে ঢুকে পড়ার ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকতে পারে বদলে যাওয়া পরিবেশ, সংকুচিত বিচরণক্ষেত্র কিংবা মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর ক্রমশ কাছাকাছি চলে আসা।
এদিকে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালামের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে চাননি।
-পতাকানিউজ/এমআরআর

