চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন নিয়ে সরকারের উদ্যোগে নতুন মোড়। বিদেশি অপারেটরের হাতে টার্মিনাল পরিচালনা এবং ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব ঘিরে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও শ্রমিক মহলে চলছে তুমুল আলোচনা। এরই মধ্যে ট্যারিফ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে আদালত।
সরকার বলছে, এই সিদ্ধান্ত দেশের বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধিকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। তবে অংশীজনদের মতে, এমন পরিবর্তন যদি সহনীয় ও স্বচ্ছতার অভাবে হয়, তবে তা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ততম বন্দরগুলোর একটি। প্রতিবছর এখান দিয়ে দেশের মোট রপ্তানি–আমদানির প্রায় ৯২ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে বন্দরের কার্যক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
সরকার সম্প্রতি লালদিয়ার চর কনটেইনার ইয়ার্ড উদ্বোধন করেছে, যার ধারণক্ষমতা ১০ হাজার টিইইউএস (TEUs)। একইসঙ্গে বন্দর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে চারটি নতুন টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এরই মধ্যে ট্যারিফ পুনর্বিবেচনা ও বেসরকারি অপারেটরের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। একই সময় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, উন্নয়ন চাই, তবে আলোচনার মাধ্যমে। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
সোমবার (১০ নভেম্বর) পতেঙ্গার লালদিয়ার চর কনটেইনার ইয়ার্ড উদ্বোধনকালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বন্দর নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলবে। কিন্তু উন্নতি করতে হলে প্রযুক্তি, অর্থ ও দক্ষতা প্রয়োজন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বেশিরভাগ বন্দর বেসরকারি অপারেটররা পরিচালনা করে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?
তিনি আরও বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে নেদারল্যান্ডসের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তারা যেটা চাইছে, আমরা তা মানিনি। দেশের ক্ষতি করে কাউকে বন্দরের কোনো টার্মিনাল দেওয়া হবে না। উপদেষ্টা জানান, বন্দরের কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৫৬ হাজার টিইইউএস থেকে বেড়ে ৬৬ হাজারে উন্নীত হবে। নতুন বিনিয়োগে ৪–৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূলধন প্রবাহিত হতে পারে।
১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছিল। চার দশক পর তা হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ব্যবসায়ীরা আয় করছেন ১ হাজার টাকা, বন্দর পাচ্ছে ৫০০ টাকা। আমরা জনবল দিয়ে বন্দর চালাচ্ছি, তাই ট্যারিফ সংস্কার জরুরি।
তবে ব্যবসায়ী সমাজের দাবি, ট্যারিফ বাড়ানো হোক, কিন্তু তা যেন সহনীয় মাত্রায় হয়। চট্টগ্রাম চেম্বারের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমরা জানি ট্যারিফ বাড়ানো দরকার। কিন্তু হঠাৎ করে চাপিয়ে দিলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলেছে শ্রমিক সংগঠন ও বামপন্থী দলগুলো। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (চট্টগ্রাম জেলা) এর সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও বন্দর সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুচ্ছাফা ভূঁইয়া বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর একটি জাতীয় সম্পদ। এখানে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ মানে সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি। সিদ্ধান্তে কোনো স্বচ্ছতা নেই।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে ‘গ্লোবাল বাস্তবতা’ হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, বন্দরের পরিচালনা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও গুরুত্বের দিক থেকে কিছুটা কম। তবে বিদেশিদের সম্পৃক্ততা থেকে শেখার সুযোগ আছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নতুন মাশুল আদায় নিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তের কার্যক্রম এক মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ রোববার রুলসহ এ আদেশ দেন। একজন কর্মকর্তা বলেন, ট্যারিফ সংস্কারের লক্ষ্য কারও ওপর চাপ সৃষ্টি নয়। বরং নতুন বিনিয়োগ ও উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা। তাই ব্যবসায়ী মহলের মতামত নেয়া হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর, নতুন ইয়ার্ড, এবং ট্যারিফ পুনর্বিন্যাস সবকিছুই উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, “উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন সিদ্ধান্ত হবে স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং দেশের স্বার্থনির্ভর।
পতাকানিউজ/এএস/কেএস

