ঢাকার হাইকোর্ট–সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের পাশে রাখা দুটি নীল ড্রাম যেন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভয়াবহ এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। ড্রামের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের বিচ্ছিন্ন ২৬টি দেহাংশ। পরে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত করে, লাশটি ৪২ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ীরই।
ঘটনার পরদিন শুক্রবার (১৩ নভেম্বর) শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন আশরাফুলের বোন আনজিরা বেগম। তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন আশরাফুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জরেজ মিয়া। মামলায় তাঁকে একমাত্র নামীয় আসামি করা হয়েছে, সঙ্গে অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও কয়েকজনকে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্দেহের কেন্দ্রে ঘনিষ্ঠ বন্ধু
আনজিরা বেগম ঢামেক মর্গে মরদেহ গ্রহণের সময় সাংবাদিকদের কাছে বলেন, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস—জরেজ মিয়াই আশরাফুলকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন। তিনি সরাসরি দাবি করেন, “জরেজ মিয়া আমার ভাইকে খুন করেছেন। আমি তার ফাঁসি চাই।”
তবে কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—তা নিয়ে তিনি বা পরিবারের অন্য সদস্যরা কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তাঁদের ধারণা, জরেজ গ্রেপ্তার হলে হত্যার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালিদ মনসুর বলেন, এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত পরিকল্পিত ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে ঘটানো হয়েছে।
ঢাকা আসার পর থেকেই আচরণে মিলেছিল অস্বাভাবিকতা
পরিবারের দেওয়া তথ্যানুসারে, আশরাফুল তিন দিন আগে রংপুর থেকে বের হন বন্ধু জরেজ মিয়ার সঙ্গে। কাঁচামালের পাওনা টাকার একটি লেনদেনের কথা ছিল তাঁদের ঢাকা সফরে।
রওনা হওয়ার পরদিন বোনের সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা বলেছিলেন আশরাফুল। জানান, তাঁরা তখন নারায়ণগঞ্জে আছেন এবং একজন পাওনাদারের টাকা পাওয়ার অপেক্ষায়। এরপর আশরাফুলকে আর সরাসরি পরিবারের কেউ ফোনে পাননি।
পরিবারের দাবি—দিনভর ফোন করলেও জরেজই আশরাফুলের ফোন ধরছিলেন। কখনো বলছেন, “আশরাফুল ব্যস্ত”, কখনো “কালেকশনে গেছে।” স্ত্রী লাকী বেগমও বারবার ফোন করলে একইভাবে জরেজই তাঁর স্বামীর ফোন রিসিভ করতেন।
শুক্রবার আশরাফুলের বোন জরেজের বাসায় গিয়ে জানতে চান আশরাফুল কোথায়। তখন জরেজের স্ত্রী ফোন দিলে তিনি নাকি দাবি করেন—আশরাফুলের ফোন তিনি “ড্রেনে কুড়িয়ে পেয়েছেন”।
ড্রামে মিলল লাশ, শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ
গতকাল বিকেলে আশরাফুলের স্বজনেরা যখন রংপুরের বদরগঞ্জ থানায় খোঁজ নিতে যান, তখনই তারা জানতে পারেন—ঢাকায় কাটা অবস্থায় একটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। নীল ড্রামের ভেতরে পাওয়া ক্ষতবিক্ষত দেহাংশগুলোর আঙুলের ছাপ মেলাতেই পুলিশের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নির্মম সত্যটি।
খবর পেয়ে রাতেই ঢাকায় রওনা দেন পরিবারের সদস্যরা। আজ সকালে ঢামেক মর্গে গিয়ে তাঁরা আশরাফুলের লাশ শনাক্ত করেন। সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়েন বোন আনজিরা বেগম।
পরিবারে শোক, তদন্তে নানা প্রশ্ন
আশরাফুল রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর ঘরে রয়েছে ১০ বছরের এক মেয়ে ও সাত বছরের এক ছেলে। পরিবার বলছে, তিনি নিয়মিত ট্রাকে করে ঢাকার বাজারগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহ করতেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, আশরাফুল ঢাকায় আসার পর থেকে তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফোন কল, সিসিটিভি রুট ও শেষবার যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল—এসবই এখন তদন্তের মূল সূত্র।
তদন্তে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে
• আশরাফুল ঢাকায় আসার পর কেন তিনি একবারও নিজে ফোন ধরেননি?
• জরেজ কেন বারবার আশরাফুলের ফোন রিসিভ করছিলেন?
• জরেজের দাবি—আশরাফুলের ফোন ড্রেনে পেয়েছেন—এই কথার পেছনে আসল সত্য কী?
• কীভাবে, কোথায় এবং কারা মিলে ২৬ টুকরায় হত্যা করা হলো?
• ড্রাম দুটি কার, কোথা থেকে আনা হয়েছিল?
পুলিশ বলছে, সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলছে বিশদ অনুসন্ধান। তবে পরিবার ও স্থানীয়দের ধারণা—হত্যাকাণ্ডের চক্রটি একক কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। এতে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে এখনো কিছু প্রকাশ না করলেও পুলিশ বলছে, তারা দ্রুতই মূল রহস্য উদ্ঘাটনের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
পতাকানিউজ/এনটি

