দেশে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়; বরং বছরজুড়ে মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতকালেও রোগের প্রকোপ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদিও সাম্প্রতিক এক সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবুও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখনও আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছেন না।
গতকাল দেশে ৪১০ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নভেম্বর মাসেই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক, প্রায় ২৩ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি মাসে ডেঙ্গুতে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা এই মৌসুমের সর্বোচ্চ। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ৩৭৭ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯৩ হাজার ১৯৪ জন মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬২.৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭.৭ শতাংশ নারী।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ১৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন, কার্যকর পরিকল্পনার অভাব এবং মশক নিধনে ব্যর্থতার কারণে এ মৌসুমে আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবেও লক্ষাধিক ছাড়াতে পারে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নভেম্বরে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার উপদ্রব কমেনি এবং ডিসেম্বরেও রোগের প্রকোপ অব্যাহত থাকবে। তারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে আগামী বছরের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন জানিয়েছেন, নভেম্বর মাসে এডিস মশার বিস্তার কমার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তা যথেষ্টভাবে কমেনি। ফলে শনাক্ত রোগী এবং মৃত্যুর উভয় দিক থেকে নভেম্বরে মৌসুমের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যদি আগামী মাসে আবার বৃষ্টি হয়, তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে এবং ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় নতুন ভর্তি ২০৩ জনের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১০২ জন, ঢাকা সিটি করপোরেশন বাইরে ৯৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণে ৮ জন। চট্টগ্রামে ১৩৭ জন, বরিশালে ৩৯ জন এবং ময়মনসিংহে ৩১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও রংপুরে নতুন কোনো রোগী ভর্তি হয়নি। একই সময়ে ৪৩৩ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
ডেঙ্গুর ইতিহাস দেশে নতুন নয়; ২০০০ সালে ঢাকায় প্রথম প্রকোপ দেখা দেয়। সেই সময় ৫৫৫১ জন আক্রান্ত হন এবং ৯৩ জন মারা যান। পরবর্তীতে রোগটি ক্রমশ মারাত্মক রূপ নেয়। ২০২৩ সালে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে—তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত ও ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু। ২০২৪ সালে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৫৭৫ জন মারা যান।
এভাবে ডেঙ্গু এখন বছরের অধিকাংশ সময়েই দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশক নিধন ও কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া প্রকৃতির ঋতুচক্র এবং আবহাওয়ার অনিয়মিত পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।
পতাকানিউজ/এনটি

