প্রায় দুই দশক পর বাংলাদেশে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। এবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তাঁর কাঁধে ভর করেছে ভঙ্গুর অর্থনীতির বোঝা।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বোঝার ভার টানতে তারেক রহমানের সঙ্গী হয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাদের সামনে যে অর্থনৈতিক চাপ তা যতো দ্রুত সরাতে পারবেন, ততোই দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গল বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ত্রিমুখী চাপে নতুন সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে এক কঠিন বাস্তবতায়। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি—ফলে বাজেট ঘাটতি ও তারল্য সংকট আরও তীব্র। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির বদলে কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, আস্থার সংকট কাটানো থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সংস্কার—কমপক্ষে আটটি অগ্রাধিকার একসঙ্গে এগোতে হবে।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কায় যে অর্থনৈতিক চাপ শুরু হয়, ২০২২ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় তা গভীর হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি এলেও অভ্যন্তরীণ খাত রয়ে গেছে চাপে। ডলার সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ সুদের হার ও বিনিয়োগে স্থবিরতা মিলিয়ে বেসরকারি খাত কার্যত অপেক্ষমাণ অবস্থায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে প্রায় ৬৫ কোটি ডলার—যার বড় অংশই পুনঃবিনিয়োগ; নতুন পুঁজি প্রবাহ সীমিত। দেশি বিনিয়োগও মন্থর।
জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২.৩২ শতাংশ—স্মরণকালের সর্বনিম্ন বৃদ্ধির হারগুলোর একটি। উচ্চ সুদ, অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা—এই তিন কারণকে মূল দায়ী করা হচ্ছে।
সুদের হার ১৬ শতাংশ, ডলার ১২৩ টাকা: খরচ বেড়েছে বহুগুণ
সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতায় নীতিগত সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডলারের বিনিময় হার ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকায় স্থিত হয়েছে।
এর ফলে আমদানিনির্ভর শিল্পের কাঁচামাল ব্যয় বেড়েছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে, মূল্যস্ফীতির চাপও কমেনি। যদিও ডলারের বাজার এখন তুলনামূলক স্থিতিশীল, উদ্যোক্তাদের মতে সুদের হার কমানো ছাড়া বিনিয়োগে গতি ফেরানো কঠিন।
অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত এখন তারল্য ও আস্থার সংকটে। কিছু ব্যাংক রপ্তানি আয়ের বিপরীতে ডলার পরিশোধেও হিমশিম খাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ঋণ বিতরণে সতর্কতা আরও কঠোর হয়েছে।

খাতটি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন :
• খেলাপি ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি
• দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন
• আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা
• স্বচ্ছতা ও তদারকি জোরদার
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি: সম্ভাবনার খাত, আছে চ্যালেঞ্জও
চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২১.৭৫ শতাংশ; জানুয়ারিতে একক মাসে প্রবৃদ্ধি ৪৫ শতাংশের বেশি। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখতে হুন্ডি দমনে কঠোরতা ও ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা জোরদার জরুরি।
তবে টানা কয়েক মাস রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহ সমস্যার প্রভাব রয়েছে। শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হলে রপ্তানির পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
অর্থসংকট কাটাতে প্রয়োজন খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন সরকারের জন্য অর্থসংকট কাটাতে খাতভিত্তিক এবং সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য। উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন এবং নীতির ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা প্রদান সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, কারণ বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া রাজস্ব বৃদ্ধির পথে অগ্রগতি সম্ভব নয়।
ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন, লাইসেন্সিং, কর ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখা এবং শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুতের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি ফেরে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায়, তারল্য বৃদ্ধি এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোও অপরিহার্য, পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণ ও অপচয় রোধের পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈদেশিক খাতে স্বল্পসুদে ঋণ সংগ্রহ এবং রেমিট্যান্স ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ নিশ্চিত করা হলে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার শক্তিশালী হবে এবং আমদানি-রপ্তানি খাত গতিশীল হবে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে জানান, ব্যবসা চাঙা না হলে রাজস্ব বাড়বে না, আর রাজস্ব না বাড়লে বাজেট ঘাটতি কমানোও কঠিন হবে; তাই দুর্নীতি ও অপচয় রোধসহ এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করাই সরকারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি।
অর্থনীতির বর্তমান সংকট কেবল সংখ্যার সংকট নয়; এটি আস্থার সংকটও। বিনিয়োগকারী, আমানতকারী ও ভোক্তা—তিন পক্ষের মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে না পারলে নীতিগত উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
সরকার যদি সমন্বিতভাবে রাজস্ব, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ও রপ্তানি খাতে পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে ধীরে ধীরে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। অন্যথায় উচ্চ সুদ, নিম্ন বিনিয়োগ ও সীমিত প্রবৃদ্ধির চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
-পতাকানিউজ

