বাংলাদেশকে মারাত্মকভাবে জ্বালানি সংকটে ফেলেছে হরমুজ প্রণালী। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার দোসর ইসরায়েল যৌথভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কৌশলগত কারণে ইরান বন্ধ করেছে হরমুজ প্রণালী। যে প্রণালী দিয়ে বিশ্বের অন্তত ২০ শতাংশ জ্বালানী রপ্তানি হয়।
এমন গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হওয়ার পর বিশ্বের অন্য দেশের মতো জ্বালানি সংকটে পড়েছে বাংলাদেশও। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি সংগ্রহের নতুন মানচিত্র খুঁজে নিচ্ছে। সেই মানচিত্রে শক্তভাবে যুক্ত হচ্ছে যাতে দুটি দেশ। সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া।
এছাড়া রাশিয়ার তেল কেনার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু রাশিয়ার তেলের ক্রয়ের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার খড়ঙ্গ থাকায় সেটি এখনো সম্ভব হয়ে উঠেনি। যদিও সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে দেনদরবার করছে রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল যখন বাংলাদেশের জন্য প্রায় দুঃষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে, তখনই আশার আলো জ্বালিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠার পর বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য হয়ে বিকল্প ভাবতে হচ্ছে। যদি আগে থেকেই বিকল্প পাইপলাইন শক্ত থাকতো, তাহলে বাংলাদেশ আরো সহজে সংকট মোকাবেলা করতে পারতো।
কিন্তু এখন তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এছাড়া এতোকাল বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী সরকার ব্যবস্থা ছিলো। এরপর অন্তবর্তীকালীন প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। সেই সময় বিকল্প পাইপলাইন তৈরি হয়নি।
অবশ্য, মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর জ্বালানি সংগ্রহের বিকল্প প্রস্তাবণাও বাংলাদেশে অতীতে জোরালোভাবে আলোচিত হয়নি। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধের প্রভাবেই বাংলাদেশ এবার সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার মতো দেশে তেলের সন্ধান শুরু করেছে এবং ইতোমধ্যেই কিছু তেল সংগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরতা
বাংলাদেশের চাহিদার তুলনায় তেল উৎপাদন হয় মাত্র বছরে মাত্র ৩৫ লাখ ব্যারেল। দেশে জ্বালানি তেলের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল। সেই হিসেবে দেশে উৎপাদিত তেল দিয়ে মাত্র ১২ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। বছরের বাকি ৩৫৩ দিনের তেল আমদানি করতে হয় সরকারকে। দেশে বার্ষিক তেলের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ব্যারেল।
সেই হিসেবে বলা যায়, অন্তত ৯৫ শতাংশ তেল আমদানি করে মূলত বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশ। এই আমদানির পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ৭-৮ মিলিয়ন টন পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত তেল। যা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে অন্যান্য চাহিদা মেটানো হয়। এছাড়া ১০০টির বেশি এলএনজি কার্গো এবং কয়লা আমদানি করতে হয়।

সংকেট আশার আলো সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য মতে, একাধিক কারণে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কাছে সিঙ্গাপুর জ্বালানিখাতে আশার আলো হয়ে উঠেছে। কারণ, পরিশোধিত তেলের জন্য এশিয়ার অন্যতম বড় হাব সিঙ্গাপুর। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি তেল মজুদ থাকে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে মজুদ থাকা তেল রপ্তানি করে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক কম সময়ে সিঙ্গাপুরের তেল সংগ্রহ করা যায়।
অবশ্য, স্পট মার্কেটে জ্বালানির দাম তুলনামূলক বেশি। তারপরও কৌশলগতভাবে সিঙ্গাপুর এখন জ্বালানি সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনে পরিণত হয়েছে।
সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া থেকে কত শতাংশ ডিজেল আসে
হালসময়ে সিঙ্গাপুর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল সংগ্রহ করছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থ বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ প্রায় ২৩ লাখ টন ডিজেল আমদানি করেছে। এর মধ্যে শুধু সিঙ্গপুর থেকেই এসেছে প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ৪১ শতাংশ। এছাড়া সিঙ্গাপুরের পাশের দেশ মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ২৪ শতাংশ। দুই দেশ থেকে বাংলাদেশ ডিজেল সংগ্রহ করেছে ৬৫ শতাংশ। এর বাইরে ১৪ শতাংশ ডিজেল ভারত এবং বাকী ২১ শতাংশ ডিজেল অন্যান্য দেশ এবং স্থানীয় পর্যায় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ বেশি পরিমাণে ডিজেল সংগ্রহ করেছে সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া থেকে। তৃতীয় অবস্থানে আছে ভারত। এই তিন দেশ থেকে দেশের চাহিদার ৭৯ শতাংশ ডিজেল সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। তাই এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ডিজেল প্রাপ্তি কঠিন হলেও সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া থেকে সেই চাহিদাপূরণের চেষ্টা করছে সরকার। সব শেষ গত শুক্রবার চট্টগ্রাম বন্দরে সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। আর শনিবার ৩৪ হাজার টন তেল নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে ‘শান গ্যাং ফা জিয়ান’ নামের একটি জাহাজ।
শক্ত হচ্ছে মালয়েশিয়ার অবস্থান
সিঙ্গাপুরের পাশের দেশ মালয়েশিয়ার রিফাইনারি শিল্প বড় হচ্ছে। একাধিক আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির কার্যযক্রম রয়েছে রয়েছে সেই দেশে। সিঙ্গাপুরের মতো মালয়েশিয়াতেও স্পট মার্কেটে তেল বিক্রি হয়। মজুদও থাকে বেশি। ফলে মালয়েশিয়া আঞ্চলিক সরবরাহ লাইনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। এই কারণে সিঙ্গাপুরের মতো মালয়েশিয়াও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের কাছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তথ্য এক নজরে:
মোট জ্বালানি চাহিদা : আমদানিনির্ভর প্রায় ৯০%+
বছরে জ্বালানি আমদানি : প্রায় ৭-৮ মিলিয়ন টন
ডিজেল আমদানি :
সিঙ্গাপুর থেকে : প্রায় ৪০%
মালয়েশিয়া থেকে : প্রায় ২৪%
গড় মজুদ : প্রায় ১৪–১৫ দিন (২ লাখ টন ডিজেল)
শুক্রবার ও শনিবার সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৬১ হাজার টন ডিজেল
থেকে এসেছে ২৭ হাজার টন,
শনিবার মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৩৪ হাজার টন।

কৌশলগত গুরুত্ব
বাংলাদেশে কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা নেই। এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন জ্বালানিখাত সংশ্লিষ্টরা। গড় মজুদ ধরে রেখে এতোদিন কার্যক্রম চলেছে। কিন্তু যুদ্ধকাল বা সংকট সময়ের কৌশলগত মজুদ কতোদিনের হবে তা নিয়ে আগের সরকারগুলো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে বর্তমান সরকার নতুন দায়িত্ব নিয়েই সংকটে পড়েছে। ভবিষ্যতে এই কৌশলগত ঝুঁকি এড়ানোর পরিকল্পনা বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে আশা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে সরকার কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা। পাশের দেশ ভারত থেকে আগের চুক্তি অনুসারে প্রায় ২০ হাজার টন ডিজেলে এসেছে বাংলাদেশে। প্রয়োজনে স্পট মার্কেট থেকে দ্রুত ক্রয় করে দেশে চাহিদা পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সংকট মোকাবেলার কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে এশিয়ার বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদিও সরকার আরো একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। অর্থ্যাৎ, একক নির্ভরশীল না হয়ে একাধিক উৎস তৈরি করতে চাইছে। যাতে ভবিষ্যতে সংকট শুরু হলেও দ্রুত মোকাবেলার মতো উৎস সরকারের কাছে থাকে।
-পতাকানিউজ

