বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে এখনো পর্যন্ত যতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে- তার বেশিরভাগ নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক আছে। সুক্ষ্ম কারচুপি, স্থুল কারচুপি থেকে শুরু করে রাতে ভোট ডাকাতি-সবই দেখেছে বাংলাদেশ। এসব নির্বাচনে যারা জয় পেয়েছেন তাদের কাছে ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়। আর পরাজয়ী দলের ভাষায় হয় ভোট চুপি, ডাকাতি কিংবা কারচুপি।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে এখনো পর্যন্ত যতো সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা-যাওয়া করেছে তার মধ্যে কোন সরকারই ভোট গ্রহণ পদ্ধতি ডিজিটাল সংস্কার করেনি। নানা ধরনের আইন সংস্কার করেছে, স্বচ্ছ ব্যালট বক্স কিংবা মেশিনে ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) পদ্ধতি যুক্ত করেছে। এসব করেও সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার সুযোগ খুব বেশি পাননি। পেশীশক্তি বলে বলিয়ানরা ইভিএম মেশিনে জোরপূর্বক তাদের পছন্দের প্রতীকে ভাট আদায় করে ছেড়েছে -এমন অভিযোগ যেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডংসম।
জাল ভোট এবং রাতের ভোট- সবই ভোটই সম্ভব এই দেশে। তার নজির ভুরিভুরি। এমন বাস্তবতায় অতীতের কিংবা বিদ্যমান ভোটগ্রহণ পদ্ধতি বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন কি আদৌ সম্ভব? -সেটিই এখন সাধারণ ভোটারদের বড় প্রশ্ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর পুরো বাংলাদেশ জুড়ে ‘সংস্কার’ ‘সংস্কার’ রব পড়ে গেছে। চারদিকে এতো সংস্কার প্রস্তাব যে কোন সংস্কারটি আগে করতে হবে- সেই সিদ্ধান্ত নিতেই যেন অন্তবর্তীকালীন সরকারের গলদঘর্ম অবস্থা।
চারদিকে এতো সংস্কার প্রস্তাব উঠলো যে এর মধ্যে ডিজিটাল বা আধুনিক পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ বিষয়ে ‘সংস্কারের প্রয়োজনীয়’ শব্দটি যেন অনুচ্চারিতই রয়ে গেল। কিন্তু বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের স্বার্থে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সাধারণ ভোটারদের ভোট দেয়ার অধিকার শতভাগ নিশ্চিত এবং নির্বিঘ্ন করা। ভবিষ্যতে ভোট চুরি, কারচুপি কিংবা রাতে ভোট ডাকাতিরোধ করতে না পারলে আদতে কোনো সংস্কারের প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না।
এখন প্রশ্ন হতে পারে সাধারণ ভোটারদের ভোটদানে সর্বাধিক নিরাপদ এবং সুষ্ঠু পদ্ধতি কি হবে? -সেই বিষয়ে এবার আলোকপাত করা যাক। পাঠক, চলুন এবার একটু চোখ বন্ধ করে নিজেকে স্বপ্নরাজ্যে নিয়ে যাই। মনে মনে স্বপ্ন দেখি। একটি ভোট কেন্দ্রের স্বপ্নরেখা আঁকি। কেমন ভোট কেন্দ্র চাই? কেন চাই? কতোটা নিরাপত্তার মধ্যে চাই?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোট কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করে ভোটগ্রহণ করা হয়। তাই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কল্পনায় নিই। চারপাশে সীমানা প্রাচীর দেয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে আছেন সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, ও আনসার সদস্য। তারা তল্লাশী করে নিশ্চিত হবেন -ভোটারের শরীরে লুকানো অবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্র নেই। আরো আধুনিক পদ্ধতি -ফটকে প্রবেশের সময় বসানো হয়েছে একটি মিলিমিটার ওয়েব স্ক্যানার (বডি স্ক্যানার মেশিন)। এই স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে একজন ভোটার প্রবেশ করলেন। পরীক্ষা হয়ে গেল ভোটারের শরীরে লুকানো অবস্থায় কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র নেই।
এবার ভোটার কেন্দ্রে প্রবেশের আগমুহূর্তে একটি যন্ত্রের সামনে দাঁড়ালেন (ফেস রিকগনিশন সিস্টেম)। এই মেশিনই বলে দেবে আপনি ওই কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন কি না? মানে- আগে থেকেই নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেসে সংরক্ষিত তথ্য থেকে ওই কেন্দ্রের ভোটার তালিকা এবং তালিকাভুক্ত ভোটারদের ছবি ওই মেশিনে সেটিং করা থাকবে। ওই যন্ত্রের সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির মুখমণ্ডল পরীক্ষা করে যদি ফেস রিকগনিশন মেশিন সঠিক পায়, তাহলেই মেশিন বুঝে নেবে -ওই ব্যক্তি এই কেন্দ্রের ভোটার এবং ভোটারকে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেবে।
এখানে বাড়তি সুযোগ থাকবে কিছু। কেন্দ্রে কয়টি বুথ আছে? এক সঙ্গে কতোজন ভোটার ভোট দিতে পারবেন? -এসব আগে থেকেই নির্ধারিত থাকবে। এক সঙ্গে কেন্দ্রে কতোজন ভোটার প্রবেশ করতে পারবেন? -সেসব তথ্য থাকবে। সংখ্যাগুলো ডিসপ্লে বোর্ডে দেখা যাবে। কতজন ভোটার ভোট দিয়েছেন? সেই সংখ্যাও ডিসপ্লে বোর্ডে প্রদর্শিত হবে।
এবার ভোটার যান্ত্রিকতা থেকে বের হয়ে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করলেন। দেখলেন কেন্দ্রে কোনো পোলিং এজেন্ট নেই। মানে প্রার্থীর পক্ষে কেউ নেই। আছেন শুধু ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা তথা পোলিং এজেন্ট। তার সামনে একটি কম্পিউটার, প্রিন্টার এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার আছে। ভোটার এবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানারে নিজের আঙ্গুলের ছাপ দিলেন। যদি মেশিন তালিকাভুক্ত ভোটার হিসেবে দ্বিতীয় দফা নিশ্চিত হয় তাহলে অটোমেটিক একটি ব্যালট প্রিন্ট হয়ে বের হবে কম্পিউটার-প্রিন্টার মাধ্যম থেকে। মানে, আগে থেকে পোলিং এজেন্টের সামনে কোনো ব্যালট পেপার থাকবে না।
ভোটারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্ত হওয়ার পরও অটো পদ্ধতিতে ব্যালট প্রিন্ট হবে। এবার পোলিং এজেন্টের সামনে থাকা সিল হাতে নিয়ে ব্যালটসহ ভোটার গোপনবুথে গেলেন। নিজের পছন্দের প্রার্থী বা প্রতীকে ভোট দিয়ে ভোটার কেন্দ্র ত্যাগের নির্ধারিত পথ ধরে বেরিয়ে এলেন।
-পাঠক, এবার কল্পনা বা স্বপ্ন জগত থেকে বেরিয়ে আসুন। এতোক্ষণে হয়তো স্বপ্নে ভোট দিয়েছেন। এবার বাস্তবে বিশ্লেষণ করুন।
ভোটকেন্দ্রে কী কী সংস্কার হলো?
১. কেন্দ্রে প্রবেশের আগে ফেস রিকগনিশন সিস্টেম অতিক্রম করতে হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রের অভ্যন্তরে ভোটার নন এমন কারো প্রবেশ বন্ধ হয়ে গেল। মিলিমিটার ওয়েব স্ক্যানার মেশিন পেরিয়ে গেছেন। মানে-অস্ত্র নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগও পেলেন না।
২. প্রিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ব্যালট বুঝে নেয়া। -এতে আগের রাতে ভোট দেয়ার ফন্দি বিনষ্ট হলো। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করে রাতে ব্যালটে সিল মারার কু-বুদ্ধির কবর রচনা হলো। কারণ, আগে থেকে ছাপা হওয়া ব্যালট বই নেই। প্রতিটি ব্যালট প্রিন্ট হচ্ছে ভোটারের ফিঙ্গারপ্রিন্টের পর। তাই ব্যালট বই নিয়ে মনের সুখে পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে সিল দেয়ার সুযোগ নেই।
৩. কেন্দ্রের অভ্যন্তরে প্রার্থীর পক্ষে এজেন্ট না থাকায় সাধারণ ভোটারের হাত থেকে ব্যালট নিয়ে জোরপূর্বক সিল মরা বন্ধ হয়ে গেল।
৪. কেন্দ্রে বহিরাগত কেউ প্রবেশের সুযোগ না পাওয়ায় ভোটারকে প্রভাবিত করা গেল না। তিনি নির্বিঘ্নে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিলেন।
৫. ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবশেষ তথ্য বাইরে সংরক্ষিত ডিসপ্লে বোর্ডে প্রর্দশিত হলো। কতজন ভোটার ভোট দিয়েছেন? কত শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে এসেছেন ইত্যাদি।
এবার ভোট গণনার পালা। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার এবার আগে থেকে তালিকাভুক্ত প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রের নির্ধারিত কক্ষে ডেকে নিয়ে গেলেন। সেখানে সব বাক্স এনে খোলা হলো। তারপর গণনা। এখানে সুবিধা হলো, আগে থেকেই যেহেতু সবাই ডিসপ্লে বোর্ডের কল্যাণে মোট ভোটার উপস্থিতি দেখতে পারবেন-সেই কারণে কয়টি ব্যালট থাকার কথা সেটা নির্ধারিত। সেই ব্যালটগুলো গণণা করে কোনো প্রতীকে কয়টি ভোট পড়েছে-সেই তথ্য বের করা যাবে। পরক্ষণে প্রিসাইডিং অফিসার প্রার্থীদের নাম এবং প্রতীকের পাশে প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা উল্লেখ করে সিল সাক্ষর করবেন। উপস্থিত পোলিং এজেন্টরাও স্ব স্ব প্রার্থীর পক্ষে প্রাপ্ত ভোট সঠিক স্বীকার করে স্বাক্ষর করবেন। শেষে ডিজিটাল মাধ্যমে কেন্দ্রের বাইরে ডিসপ্লে বোর্ডে ভোটের ফল প্রদর্শিত হবে। সেই ফল এক ক্লিকে যাবে উপজেলা, জেলা কিংবা নির্বাচন কমিশনে। মাঝখানে কারো কাছেই ফল পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না। অটো যোগ পদ্ধতিতে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রতীকের প্রার্থীকেই জয়ী ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।
বিনিয়োগ কেন দরকার?
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার এবং সাধারণ ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেয়া নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে এই খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। রাষ্ট্র যদি ভোট গ্রহণ পদ্ধতিতে সংস্কার করে তাহলে ভোটারদের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন হবে। সেই প্রতিফলন ধরে তথা ভোটারদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সরকার গঠন করবে এবং দেশ পরিচালনা করবে।
বিশ্বের প্রতিটি দেশ নিজস্ব নিরাপত্তায় কাড়ি কাড়ি অর্থ বিনিয়োগ করে। বিনিময়ে নিশ্চিত করে জনশান্তি। জনশান্তি নিশ্চিত হলেই রাষ্ট্র থরথর করে উন্নতির দিকে এগিয়ে যায়। এরই জনশান্তি এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থকে রাষ্ট্রকে ভোটগ্রহণ ব্যবস্থায় প্রকৃত সংস্কার করতে হবে। এবং তা সর্বাগ্রেই করতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই ডিজিটাল পদ্ধতির ভোটগ্রহণে এই বিনিয়োগ দরকার।
পতাকানিউজ/কেএস

